,

রাজবাড়ীতে কুঁচিয়া মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ : আয় হচ্ছে বৈদশিক মুদ্রা

নাহিদুর রহমান হিমেল : কুঁচিয়া মাছ মুলত অঞ্চলভেদে কুঁচে, কুঁইচ্চা বা কুঁচে বাইম নামেই পরিচিত। আকৃতি বাইম মাছের মত হলেও এদেশের অধিকাংশ মানুষই ঘৃনা বা ধর্মীও নিষেধাজ্ঞা থেকেই এ মাছ থেকে দুরে থাকেন। তবুও এক শ্রেণী পেশার মানুষ এ অবহেলিত ঘৃনীত কুঁচিয়া মাছ শিকার, মজুদ এবং তা বিদিশে রপ্তানি করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। এ মাছ শিকার থেকে রপ্তানী পর্যন্ত তিনটি পর্যায়ে অথার্ৎ শিকারী, মধ্যসত্তা ভোগী ও আড়তদাররা এ ব্যবসায়ের মাধ্যেমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। খোজ নিয়ে জানা যায়, এদেশে সিলেট বরিশাল পাবনাসহ প্রায় ১০-১২ টি জেলা থেকে প্রচুর পরিমানে এ মাছ বিদেশে রপ্তানী করা হয়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এ মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। এছাড়া এ মাছে রয়েছে রক্তশূন্যতা ও বাত ব্যাথা দূর করার ক্ষমতা।

দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে সফলতার সাথে মধ্যেসত্তা ভোগী হিসাবে এ মাছ নিয়ে ব্যবসা করে আসছে রাজবাড়ী জেলার ড্রাই-আইস ফ্যাক্টারি এলাকার বাগধী পাড়ার অধিবাসী কার্তিক সরকার ও তার পরিবার। সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, আদিবাসী বাগধিদের কাছ থেকে তারা এ মাছ ক্রয় করনে এবং তা ঢাকার আড়তে বিক্রি করেন। পরে আড়তদাররা তা বিদেশে রপ্তানি করে। কার্তিক সরকার জানান, বাগধিদের কাছ থেকে কেজি প্রতি ১৫০-২৫০ টাকা দরে ক্রয় করা হয়। তারপর তা হাউজে সংরক্ষন করে প্রতি সপ্তাহে ৫-১০ মন মাছ ঢাকায় আড়তদারদের কাছে কেজি প্রতি ৫০-৭০ টাকা লাভে বিক্রি করা হয়।

মুলত চায়নিজ ও মঙ্গোলিয়ানদের কাছে এ মাছ অত্যান্ত জনপ্রিয়। Sybranchidae পরিবারের অন্তর্গত মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Monopterus cuchia। এর দেহ লম্বা এবং নলাকার। লেজ খাড়াখাড়িভাবে চাপা, ক্রমশ সরু। ত্বক স্যাঁতস্যাঁতে ও পিচ্ছিল। দেহ গাঢ় বাদামি রঙের এ মাছের উদর হালকা লাল। লম্বায় এরা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রায় সব স্বাদুপানির জলাশয়েই (খাল, বিল, হাওর, বাঁওড় ও পুকুর পাড়ে মাটির গর্তে) কুঁচিয়া দেখা যায়। পানির অগভীর ও তীরবর্তী অংশ এবং খাল পাড়ে মাটির গর্তে এই মাছের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া প্লাবিত বোরো ধানক্ষেতেও এদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।IMG_0428

রাক্ষুসে স্বভাবের এ মাছের প্রধান খাদ্য বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ, জলজ পোকা ও প্রাণী । এরা মুলত অদ্ভুতভাবে মুখ দিয়ে বাচ্চা জন্ম দেয়। একটি মা কুইচা মাছের একসাথে প্রায় সহস্রাধিক বাচ্চা দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। বছরের নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত কুঁচিয়া মাছ ধরার মৌসুম। তবে এপ্রিল মাসে বেশি পরিমাণে কুঁচিয়া মাছ পাওয়া যায়। প্রতিদিন একজন গড়ে দুই-তিন কেজি করে কুঁচিয়া মাছ ধরতে পারেন।

এ মাছ শিকারী কমল বাগধী বলেন, ‘এ মাছ ধইরাই আমাগো সংসার চলে’। তিনি আরো জানান, পুকুর অথবা বিলের পাশের ছোট ছোট গর্ত চিহ্নিত করে বড়শির সাথে কেঁচো অথবা ছোট ব্যাঙ গেঁথে এ মাছ শিকার করা হয়। এ মাছ রপ্তানিতে উত্তরার ১২ নং খাল পাড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০টি আড়ত কোম্পানি।

বিভিন্ন বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে উত্তরার এক আড়তদার নারায়ন দত্তের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রাজবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০-৪০ টন মাছ আসে। পরে তা কেজি প্রতি ২-৩ টাকা লাভে চীন, হংকং, তাইওয়ান, আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৭-৮টি দেশে রপ্তানি করা হয়।
কুঁচিয়া মাছ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও এদেশে এই মাছের বাণিজ্যিক চাষাবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এখনও তেমন কোন পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে এই মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করন এবং উৎপাদন বাড়ানো গেলে এ মাছ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ হবে।

 

আপডেট : শুক্রবার নভেম্বর ০৭,২০১৪/ ১১:৪৫ এএম/ আশিক

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর