টিভি অনুষ্ঠানে নারীকে ধর্ষণ!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১২:৩১ অপরাহ্ণ ,১৬ নভেম্বর, ২০১৪ | আপডেট: ১২:৪৩ অপরাহ্ণ ,১৬ নভেম্বর, ২০১৪
পিকচার

একুশে টেলিভিশনের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘একুশের চোখ’ দেখছিলাম গত বৃহস্পতিবার (০৬.১১.২০১৪) রাতে। আর তার বিষয় ছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ। ভাল বিষয়…।

তবে উপস্থাপক ইলিয়াস হোসাইন শুরুতেই ঘোষণা করেন ১৮ বছরের নীচে যাদের বয়স তারা যেন এই অনুষ্ঠান না দেখেন। এই পর্বটি প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য!( একুশে টিভি কী এডাল্ট চ্যানেল!)
যাক, দর্শক হিসবে আমি একাই ছিলাম। আর আমি প্রাপ্ত বয়স্ক…..

অনুষ্ঠান শুরু হল একটি যৌথ পরিবারের গল্প দিয়ে। উপস্থাপক নিজেই ভোরে সেই পরিবারের বেডরুমে সরাসরি ঢুকে গেলেন ক্যামেরা নিয়ে , কিন্তু বেডরুমে সবাই ঘুমিয়ে আছেন( নাটক আর কাকে বলে)। এরপর তিনি সেই ঘুমন্ত মানুষগুলোর বর্ণনা দিলেন এবং যৌথ পরিবারের নানা ইকিবাচক দিক তুলে ধরলেন। এপর্যন্ত নাটক হলেও আপত্তিকর কিছু নেই।

কিন্তু এর পরেই শুরু হল আসল ঘটনা। যার সঙ্গে ওই যৌথ পরিবারের কোন সম্পর্ক নেই। এটি আরেকটি একক পরিবার। যে পরিবারের কর্তা থাকেন প্রবাসে আর তাঁর স্ত্রী ঢাকায়। ঢাকায় ফিরে স্বামী আবিস্কার করেন যে তাঁর স্ত্রী ‘অনৈতিক’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এনিয়ে চলে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ। স্বামী অভিযোগ করেন বুক ফুলিয়ে আর স্ত্রী কাপড়ে মুখ ঢেকে।

কিন্তু সাংবাদিক কাম উপস্থাপক আর কিছু রাখ-ঢাক করলেন না। তিনি সেই নারীর স্টিল ছবি দেখিয়ে দিলেন নানা ভঙ্গিমায়। তার পর স্বামীর ল্যাপটপ থেকে আবিস্কার করা স্ত্রীর কথিত অনৈতিক সম্পর্কের ভিডিও চিত্র। সেখানে কৌশল হিসেবে ফুটেজ নেগেটিভ করে দেখান হল, কিন্তু পুরো মুভমেন্টই স্পষ্ট। যা দেখতে যে কারুর রুচিতে বাধবে। সাংবাদিক( না সাংঘাতিক) সাহেব হয়তো বলবেন, তিনি নীতিমালা মেনে ছবিটি ব্ল্যাক করেছেন, যাতে নারীকে কেউ চিনতে না পারে। কিন্তু হায় কার বুঝতে আর বাকি আছে যে আগেই স্পষ্টভাবে স্টিল ছবির নারীই এই নারী।

এরপর পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে স্টিল ছবির সঙ্গে লিংক করে ওই ভিডিও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান হল (বিকৃত রুচি আর কাকে বলে!)। পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই অনুসন্ধানের নামে এক নারীর ওপর চালান হল সাংবাদিকতার নামে পাশবিকতা।

এই মহান(!) স্বামী ওই নারীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ করার পরও তাকেই আবার চান। তাঁর সঙ্গে থাকতে চান ( কী বিস্ময়কর)। আর উপস্থাপক সেই বক্তব্য প্রচার করে মহান দায়িত্ব পালন করেন। সবক দেন দশর্ককে। আবার ফিরে আসেন যৌথ পরিবারে। একটি নগ্ন ভিডিওকে আরেকটি যৌথ পরিবার দিয়ে সামাল দিতে চান। ভাবখানা তিনি কত বড় সাংবাদিক, আর সবাই বোকা।

বিশ্লেষণ এবং কয়েকটি প্রশ্ন:

১.ওই নারীর কথিত অনৈতিক কাজের ভিডিও ধারণ করেছে কারা? নিশ্চয়ই নারী নিজে নন। যারা করেছেন তারা তাঁকে ব্ল্যাক মেইল করার জন্যই করেছেন। তারা আবার তাঁর স্বামীর কাছে তা পৌঁছেও দিয়েছেন। ওই চক্রটি ভিডিও ধারণ এবং তা ছড়িয়ে দিয়ে দু’টি অপরাধ করেছে। তাঁর স্বামী একুশে টেলিভিশনকে তা সরবরাহ করেও অপরাধ করেছেন। আর একুশে টেলিভিশন নারীকে চিহ্নিত করে তা প্রচার করে একই অপরাধ করেছে।

২.এখন এই নারীর জীবনকে শেষ করার দায় কে নেবে? তিনিতো আর স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবেন না। এমনকি আত্মহত্যাও করতে পারেন। আইন বলে, এখানে একুশে টেলিভিশন, নারীর স্বামী এবং যারা ভিডিও করেছেন সবাই সমান অপরাধী। এবং একুশে টেলিভিশনের অপরাধের মাত্রা সবচেয়ে বেশি । কারণ তাদের সম্প্রচারের কারণে এখন দেশে বিদেশে অসংখ্য দর্শক এই নারীকে দেখলেন, চিনলেন। এটা মিডিয়ার নারী নির্যাতন ছাড়া আর কিছুই নয়।

৩.একই সঙ্গে একুশে টেলিভিশন তার দর্শকদের মধ্যে পর্ণগ্রাফি ছড়ানোর দায়েও দায়ী। তারা নগ্ন ভিডিও দেখিয়ে সম্প্রচার নীতিমালার লঙ্ঘন করেছেন। এটাও আইনের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ।

৪.কিন্তু আরো বড় কথা হলো, পুরো অনুষ্ঠানটি দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ওই নারীর স্বামীকে বাঁচানো এবং নারীকে শেষ করে দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। তাহলে প্রশ্ন- এতবড় জঘন্য অপকর্ম কেন করলেন একুশের চোখের উপস্থাপক এবং সাংবাদিক। কিসের লোভে, কিসের বিনিময়ে!

৫.দেশের নারী নেত্রী, সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কমিশন আপনারা চুপ কেন? একটি গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে এক নারীকে ধর্ষণ করা হল- আপনাদের বিবেক এখন কোথায়? আর এখন কোথায় পুলিশ প্রশাসন? কোথায় তথ্য প্রযুক্তি আইন? কোথায় নারী নির্যাতন আইন? এসবই কী রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের জন্য? সাধারণ মানুষ কী এইসব আইনের আশ্রয় পাবেনা?

( দ্রষ্টব্য: এখানে অনুষ্ঠানের ইউটিউবের ভিডিও লিংকটি দেয়া যেত। কিন্তু তা নৈতিকতা বিরোধী বলে দেয়া হল না। )

লেখকঃ জেমসন মাহবুব
স্টাফ রিপোর্টার, একাত্তর টেলিভিশন

 

 

 

আপডেট : রবিবার নভেম্বর ১৬,২০১৪/ ১২:২৯ পিএম/ আশিক

 


এই নিউজটি 1380 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments