রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ হরিপদের বিরুদ্ধে ৪২লাখ ২৭হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১:৫৩ অপরাহ্ণ ,২৪ নভেম্বর, ২০১৪ | আপডেট: ১:৫৩ অপরাহ্ণ ,২৪ নভেম্বর, ২০১৪
পিকচার

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজবাড়ী জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ হরিপদ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ‘প্রাণি সম্পদ বিভাগের ৪২লাখ ২৭হাজার টাকা আত্মসাতসহ জনস্বার্থ বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রাণি সম্পদ মন্ত্রী বরাবর অভিযোগ করা হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর সদর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের পোল্ট্রী ও দুগ্ধ খামারীরা লিখিত এ অভিযোগটি মন্ত্রী বরাবর প্রেরন করে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ডাঃ হরিপদ বিশ্বাসের কর্তব্য অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণ, জুলুম-নির্যাতন, ঘুষ, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রাণি সম্পদ বিভাগের কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। সে একজন ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। গোলাপগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে গত ৩রা জুলাই-২০১২ তারিখে রাজবাড়ীতে যোগদানের পর অদ্যাবধি ক্ষমতার অপব্যবহার ও চরম দুর্নীতি করে সরকারী নিয়মনীতি ভেঙ্গে নিজে সম্পদশালী হওয়ার উদ্দেশ্যে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ৪২ লাখ ২৭ হাজার টাকা আত্মসাত করেছেন।

এ.কিউ.এম আসাদুজ্জামান এফ.এ (ফডার) পদে রাজবাড়ী জেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তৎকালীন জেলা প্রাণি সম্পদ ডাঃ লুৎফর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ সৌরেন্দ্র নাথ সাহা হাজিরা খাতায় তার অনুপস্থিতি হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন। ডাঃ হরিপদ বিশ্বাস আসাদুজ্জামানের অনুপস্থিতিকালীন মোট সময় নতুন সময়ের মাধ্যমে উপস্থিত দেখিয়ে বকেয়া বেতন-ভাতাদির ১০ লাখ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করে ৬লাখ টাকা ঘুষের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। উক্ত আসাদুজ্জামান বর্তমানে নড়াইল জেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তরে কর্মরত আছেন।

গত ০২/১১/২০১৩ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাংশা সফরকালে বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডের ফলক উন্মোচন করেন। তার মধ্যে কালুখালী প্রাণি সম্পদ দপ্তরের ভিত্তিপ্রস্তরও উদ্বোধন করেন। উক্ত নামফলক ক্রয়সহ অন্যান্য খরচ দেখিয়ে ডাঃ হরিপদ বিশ্বাস ৪ উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জোর পূর্বক লক্ষাধিক টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করেন। গোপালগঞ্ জেলার বাসিন্দা হওয়ায় সে সেই জেলার নাম ভাঙ্গিয়ে অব্যাহতভাবে অপকর্ম ও দুর্নীতি করে চলেছে।

অভিযোগে আরো বলা হয়, ২০১২-২০১৩ এবং ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে সরকারী গাড়ী মেরামত ও সংরক্ষণ বাবদ রাজস্বসহ বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ২ লাখ ২হাজার টাকা বরাদ্দ এনে মাত্র ২২হাজার টাকা খরচ করে ১লাখ ৮০হাজার টাকা ভূয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাত করেন। ওই দুই অর্থ বছরে তার সরকারী গাড়ী জ্বালানী খাত বাবদ বিভিন্ন খাত হতে ২লাখ ৮২হাজার টাকা বরাদ্দ এনে ৫০হাজার টাকা খরচ করে ১লাখ ৯২হাজার টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাত করেন। ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে জেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তর মেরামত ও সংরক্ষণ বাবদ রাজস্ব খাত থেকে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ এনে তার মধ্য থেকে মাত্র ১৫হাজার টাকা ব্যয় করে অবশিষ্ট ১লাখ ৩৫হাজার টাকাও একইভাবে আত্মসাত করেন। উক্ত কাজ ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে আসা বরাদ্দ থেকে করা হয়। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার কল্যাণ হাসপাতাল স্থাপনে লটারীর টিকিট বিক্রির কমিশনের ১৫হাজার টাকা বিক্রেতাদের (৪ উপজেলার কর্মকর্তা-কর্মচারী) না দিয়ে নিজেই আত্মসাত করেন। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ধুলদীজয়পুরের আবু সাঈদকে শহীদ ওহাবপুর ইউনিয়নের কৃত্রিম প্রজনন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ৫০হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করলেও অদ্যাবধি উক্ত নিয়োগ প্রদান করে নাই বা টাকাও ফেরত দেয় নাই।

রাজবাড়ী সদর, পাংশা, বালিয়াকান্দি ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ন্যাশনাল এগ্রিকালচার টেকনোলজী প্রজেক্ট (এন.এ.টি.পি) ভেড়া উন্নয়ন প্রকল্প, চেক পোস্ট প্রকল্প ও ২২টি জেলা উন্নয়ন প্রকল্প কাজ চলমান আছে। উক্ত সকল প্রকল্প থেকে গাড়ীর জ্বালানী, গাড়ী মেরামত, অফিস মেরামত, ভ্রমন ভাতা, আনুষঙ্গিক ও প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষক ভাতা হিসেবে উক্ত খাতগুলো থেকে ২বছরে ১০ লাখ টাকা আত্মসাত করেন।

ডাঃ হরিপদ বিশ্বাস ২০১২ সালের জুলাই মাসে রাজবাড়ীতে যোগদানের পর থেকে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সরকারী হাঁস-মুরগী খামারের রেস্ট হাউজে বসবাস করে উক্ত রুমে হিটার ব্যবহার করার পাশাপাশি কোন ভাড়া না দিয়ে সরকারের প্রায় আড়াই লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি করেন। এ সময়কালে সে বেতনের সাথে বাড়ী ভাড়াও উত্তোলন করেন। জেলা দপ্তরসহ ৪টি উপজেলা দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলীর ভয় দেখিয়ে এ যাবৎ প্রায় ৫লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন। সে যোগদানের পর হতে বিভিন্ন উপখাতে প্রাপ্ত প্রায় ৩লক্ষ টাকা ভুয়া-বিল ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে।

জেলা দপ্তরে কর্মরত ক্যাশিয়ার মোফাখের হোসেন একজন সৎ কর্মচারী হলেও তার অপকর্মে বাঁধা দেয়ায় তাকে বালিয়াকান্দি উপজেলা দপ্তরে বদলী করা হয়। চাকুরী দেয়ার নামে বালিয়কান্দি উপজেলার জনৈক তাপসের নিকট হতে ৫লক্ষ টাকা চুক্তি করে ২লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েও অদ্যাবধি তার চাকুরী দেয় নাই বা টাকাও ফেরত দেয় নাই।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, তার পূর্বের কর্মস্থলের আমলনামাও ভাল না। সেখানকার তার দুর্নীতিসমূহ বর্তমানে তদন্তাধীন আছে। তার স্ত্রী-কন্যা নিয়মিত ভারতে বসবাস করায় তাদের যাবতীয় অর্থ তিনি অবৈধ পথে ভারতে পাঠান।

রাজবাড়ীতে আসার পর তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রাণি সম্পদ বিভাগের ঢাকা বিভাগের কর্মকর্তা তদন্ত করে তাকে বদলীর সুপারিশ করেন। সেই সুপারিশের আলোকে তার বদলীর আদেশও হয়েছিল কিন্তু সে সময় উপজেলা নির্বাচন থাকায় সেই বদলীর আদেশ বাতিল হয়।

মুরগী বিক্রেতা, মুরগী বহনকারী ভ্যান চালক এবং ১২জন বেসরকারী মুরগী খামারীর ট্রেনিং বাবদ আড়াই লাখ টাকার মধ্যে লক্ষাধিক টাকা ও মুরগী বহনের জন্য সরকারীভাবে ২টি ভ্যান গাড়ী তৈরীর জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেলেও মাত্র ১৫হাজার টাকা খরচ করে ১টি ভ্যান তৈরী করে অবশিষ্ট ৩৫হাজার টাকা আত্মসাত করেন। অফিস মেরামত বাবদ ২ লাখ টাকা ব্যয়ের কোন টেন্ডার আহবান না করে প্রায় দেড় লাখ টাকা নিজেই আত্মসাত করে। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যয় করা না গেলেও সে তা করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করে।

সুত্র জানায়, উল্লেখিত অভিযোগের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। ভূক্তভোগীদের অভিযোগের অনুলিপি রাজবাড়ী-১ ও রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্যদ্বয়, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, উপ-পরিচালক এবং রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসককে প্রদান করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ হরিপদ বিশ্বাস অভিযোগের বিষয়সমূহ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর অধীনস্ত কতিপয় কর্মচারীর দুর্নীতি-অনিয়ম ধরায় এবং দালাল শ্রেণীর লোকজনকে প্রশ্রয় বা অনৈতিক সুবিধা না দেয়ায় তারা পারস্পরিক যোগসাজশে তাঁর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগটি করেছে।

 

 

 

আপডেট : সোমবার নভেম্বর ২৪,২০১৪/ ১২:৫৫ পিএম/ আশিক

 


এই নিউজটি 1079 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments