মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হলেও রাজবাড়ী জেলার সকল উপজেলায় ভবন নির্মাণ না হওয়া উদ্বেগজনক : এম.এ হান্নান

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ ,৫ ডিসেম্বর, ২০১৪ | আপডেট: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ ,৫ ডিসেম্বর, ২০১৪
পিকচার

স্টাফ রিপোর্টার : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম.এ হান্নান বলেছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন’ নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকার মূলক একটি প্রকল্প। এই প্রকল্প নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। আমরা বদনামের ভাগীদার হতে চাই না। প্রকল্পটির মেয়াদকাল ২০১৫ সাল পর্যন্ত। সেকেন্ড ডিভিশন যেহেতু হয়ে গেছে, সেহেতু এটার আর এক্সটেনশনের সুযোগ নাই। দুঃখজনক হলেও সত্য, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটা অঞ্চল হওয়া স্বত্ত্বেও রাজবাড়ীতে না হওয়াটা উদ্বেগের বিষয়। কেন অগ্রগতি নেই, তা জানার জন্যই আমার এখানে আসা। অনতিবিলম্বে কার্যক্রম শুরু করা না গেলে এই প্রকল্পে আর অন্তর্ভুক্ত হওয়া যাবে না।

গতকাল ৪ঠা ডিসেম্বর রাত ৯টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন উপজেলাধীন উপজেলা কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণ এবং স্থান নির্বাচন বিষয়ে’ জেলা প্রশাসন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম.এ হান্নান সভায় উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের ‘অতীত স্মরণ করিয়ে দিয়ে’ বলেন, জামালপুরের এনডিসি থাকার সময় তৎকালীন জেলা প্রশাসককে দেখেছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধণা অনুষ্ঠানে ‘একটি করে লুঙ্গি অনুদান দেয়ার সময়’ চোখের পানি ফেলতে। পরবর্তীকালে প্রথমে দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক ৩০০ টাকা করে ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর সেটাকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা হয়। সর্বশেষ প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধাকে ‘দুঃস্থ ভাতা’র পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা’র ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য প্রতি অর্থ বছরে রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ১২শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনগুলো নির্মাণের জন্য যে ১১শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে সেই টাকাও সরকারের নিজস্ব তহবীলের। সৌদি-আমেরিকা বা অন্য কোন দেশ কিন্তু এই কাজে একটি টাকাও দিচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বাদে বিশ্বের ২০৪টি দেশের আর কোনটিতেই আমাদের মতো ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ নেই। ভিয়েতনামও দীর্ঘ সাড়ে ৯বছর আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। তাদেরও লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে। তারাও তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমাদের মতো এতটা করেনি। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যা কিছু হয়েছে-তার সবই বর্তমান সরকারের সময়ে হয়েছে। সে কারণে সরকারের প্রায়োরিটির এই প্রকল্পে(মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন’ নির্মাণ কোন অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণাধীন কমপ্লেক্স ভবনের কাজে কোথাও কোন অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ বরদাস্ত করা হয়নি। অনেক জায়গার নির্বাহী প্রকৌশলীদের পর্যন্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেক জায়গায় নির্মিত ওয়াল/স্থাপনা পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। রাজবাড়ীতেও যে কাজ করা হবে, তার গুণগতমানের ক্ষেত্রেও কোন আপোষ করা হবে না।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম.এ হান্নান রাজবাড়ী জেলার সকল উপজেলার(সদর উপজেলা বাদে, সেখানে আজ শুক্রবার সকালে তিনি সরেজমিনে যাবেন) কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের ‘স্থান নির্বাচন বিষয়ে’ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের কাছ থেকে খুঁটিনাটি জেনে নেন এবং জেলা প্রশাসক কর্তৃক প্রেরিত প্রস্তাবের ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের কোন আপত্তি আছে কিনা তাও জেনে নেন। অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাচিত জায়গাগুলো যাতে সুইটেবল হয়, রেকর্ডপত্র ঠিকমতো আছে কিনা, সে ব্যাপারে সতর্ক করেন, এছাড়াও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘সম্মানী ভাতা প্রাপ্তি’ এবং সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী ‘দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মাণাধীন বাড়ী’র সংখ্যা প্রতি ৭০জনে ১জনের পরিবর্তে আরও বাড়ানো যায় কিনা সে ব্যাপারে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম.এ হান্নান মতবিনিময় সভার শুরুতে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে পরামর্শ না করে কিংবা তাকে অবহিত না করে সাম্প্রতিককালে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভবন সম্প্রসারণ কাজ শুরু করে দেয়ার অসন্তোষ প্রকাশ করলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার মোহাম্মদ আলী মন্ডল এ ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থন করে সরি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন।

এছাড়াও সচিব এম.এ হান্নান বিভিন্ন উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য নির্বাচিত জায়গাগুলোর আয়তন বা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণসহ উপজেলা প্রকৌশলীগণ উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে তিনি তাদেরও সমালোচনা করেন।

জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাজবাড়ী জেলার কোন উপজেলায়ই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নাই। জেলা সদরে একটা বিল্ডিং আছে। এখান থেকে সেটাকে ভাইটাল এক্সটেনশনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাতে সম্মত হননি। সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে রাজবাড়ী সদরের ইন্দ্রনারায়নপুর মৌজায় ৯ শতাংশ ও কালুখালীতে ৮ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব প্রেরন এবং গোয়ালন্দ ও বালিয়াকান্দিতে ১০ শতাংশ করে অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠানোর কথা উল্লেখ করে বলেন, পাংশায় পৌরসভার মধ্যে কোন খাস জমি না পাওয়ায় এখনও অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠানো যায়নি।

জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ‘সকল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স স্থাপন প্রকল্পের’ প্রকল্প পরিচালক(যুগ্ম-সচিব) মাহমুদ হাসান, ‘উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স স্থাপন প্রকল্পের’ প্রকল্প পরিচালক(যুগ্ম-সচিব) মোমিন মজিবুল হক সমাজী, পুলিশ সুপার তাপতুন নাসরীন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার মোহাম্মদ আলী মন্ডল, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মশিউর রহমান, সদর ও বালিয়াকান্দি(ভারপ্রাপ্ত) উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেওয়ান মাহবুবুর রহমান, পাংশা ও কালুখালী(ভারপ্রাপ্ত) উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আমিনুল ইসলাম খান, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার পঙ্কজ ঘোষ, গোয়ালন্দ উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ সহিদুল ইসলাম, গোয়ালন্দ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার আঃ ছামাদ মোল্লা, বালিয়াকান্দি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার এ.এ.এম আঃ মতিন, কালুখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের মোঃ আকামত আলী মন্ডল, পাংশা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার চাঁদ আলী খান এবং সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার মোঃ আঃ জলিল।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক) সোনামনি চাকমা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) গাজী মোঃ আসাদুজ্জামান কবির, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন, রাজবাড়ী কালেক্টরেটের এনডিসি মোঃ আরিফুল হক মৃদুল, সহকারী কমিশনার মোঃ মাহবুবুর রহমান ও সহকারী কমিশনার মোঃ জামরুল ইসলাম, সদর উপজেলা প্রকৌশলী স্বপন কুমার গুহ, বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ, কালুখালী উপজেলা প্রকৌশলী শেখ মোঃ আজিম উদ্দিন, পাংশা উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম এবং এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী এ.কে.এম রফিকুল ইসলাম সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সভায় এক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম.এ হান্নান বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই কার্যক্রম বন্ধ করা হবে না। তা চালু রাখার মাধ্যমেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বের করা হবে। অমুক্তিযোদ্ধারা যে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সেদিকেও সবাইকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।

পুলিশ সুপার তাপতুন নাসরীন বলেন, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ মুক্ত হলেও রাজবাড়ী মুক্ত হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর। রাজবাড়ীবাসীকে মুক্তির আনন্দ পেতে আরও ২দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আমার কাছে কয়েকজন এসেছিলেন সেদিন কোন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অনুরোধ করতে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমারতো কোন ফান্ড নেই। জানি না জেলা প্রশাসকের কোন ফান্ড আছে কি না? সে জন্য এবারের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালার সঙ্গে ১৮ ডিসেম্বরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফান্ডে কোন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করার ব্যাপারে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম.এ হান্নানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

জবাবে সচিব এম.এ হান্নান বলেন, বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনার জন্য তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে ফান্ড দেয়া হয়। এবারও দেয়া হয়েছে। বিষয়টি আগে থেকে জানা থাকলে তিনি একটা কিছু করার চেষ্টা করতেন। মেহেরপুরের জন্য যেভাবে আলাদা ফান্ডের ব্যবস্থা করা হয়, কোথাও কোথাও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরী হয়। তিনি জেলা প্রশাসককে পুলিশ সুপারের আহবানে সাড়া দিয়ে কিছু করা যায় কিনা দেখতে বলেন।

এর উত্তরে জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রতি বছরই বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এবার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি তাঁর বাসভবনে আয়োজন করা হয়েছে। ১৮ তারিখ রাজবাড়ী মুক্ত হয় বলে সেদিন আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়, যা এবারও করা হবে। তারপরও আরও কিছু করার চেষ্টা করা হবে।

 

 

আপডেট : শুক্রবার ডিসেম্বর ৫,২০১৪/ ১১:৩৯ এএম/ আশিক

 


এই নিউজটি 974 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments