শাবানার আর্তনাত পৌঁছায় না সরকারী বড় কর্তাদের কানে!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১২:২১ অপরাহ্ণ ,২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ | আপডেট: ১২:২৯ অপরাহ্ণ ,২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫
পিকচার

শিহাবুর রহমান : চাঁদ ও তাঁরা যমজ দুই ভাই। বয়স ৭ বছর। চাঁদ বাক প্রতিবন্ধী। চাঁদ রাজবাড়ী প্রতিবন্ধী স্কুলে ও তাঁরা শিশু কল্যাণ স্কুলে পড়াশুনা করছে। জন্মের ৪০ দিনের মাথায় তাদের পিতা আবুল কালাম ৫০ টাকা কেজি দরে চাল কিনে সন্তানদের মানুষ করতে পারবেন না বলে তাদের ফেলে পালিয়ে গেছে। এরপর থেকেই তাদের মা শাবানা বেগম (৩৮) মানুষের বাড়িতে কাজ করে তাদের মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছে। তবে বর্তমানে শাবানা রাজবাড়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ খুশি রেলওয়ে ময়দানে ৫দিনব্যাপী বই মেলায় পিঠা বিক্রি করছে। সেখানেই তার কাছ থেকে শোনা গেল জীবনের মর্মান্তিক কাহিনী।

শাবানার পিতার বাড়ী বালিয়াকান্দি উপজেলার হুলাইল গ্রামে। তারা ৩ বোন ও ৬ ভাই। দারিদ্রতার কারনে পড়াশুনা করা হয়নি। শাবানার বিয়ে হয় প্রায় ১৭/১৮ বছর আগে। মানিকগঞ্জে। তার স্বামীর নাম আবুল কালাম। পেশায় সে ছিল একজন রিক্সা চালক। নিজেদের থাকার জন্য একটু টুকরো জমিও তাদের ছিলনা। যে কারণে তাদের আশ্রয় হয় অন্যের বাড়ীতে। বিয়ের দু’এক বছরের মধ্যেই তাদের কোল জুড়ে আসে এক কন্যা সন্তান। নাম রাখা হয় শাহানা। শাহানার বয়স ৭/৮ বছর হলে তাকে এক বাড়ীতে কাজের মানুষ হিসেবে দেয়া হয়। সেখানেই বড় হয় শাহানা। শাহানার জন্মের কয়েক বছর পর তাদের আরো একটি সন্তান হয়। পুত্র সন্তান। নাম রাখা হয় রবিন। রবিনের বর্তমান বয়স ৯বছর। কিন্তু রবিনের ভাগ্যে জোটেনি বাবা-মায়ের স্নেহ ভালবাসা। সংসারে এতটাই অভাব ছিল যে মাত্র ২ বছর বয়সেই রবিনকে দত্তক দেয় শাবানা। শাবানা ও আবুল কালাম দম্পতি ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। যে কারণে সংসারের অভাব অনটন থাকার পরও আবারো তাদের কোল জুড়ে আসে যমজ দুই পুত্র সন্তান। অনেকটা আদর করে তাদের নাম রেখেছিলেন চাঁদ ও তাঁরা। কিন্তু বিধি বাম। চাঁদ ও তাঁরার জন্মের ৪০ দিনের মাথায় তাদের পিতা আবুল কালাম ৫০ টাকা কেজি দরে চাল কিনে তাদের মানুষ করতে পারবে না বলে বাড়ী থেকে পালিয়ে চলে যায়। কিন্তু শাবানা চাঁদ ও তাঁরাকে ফেলতে পারেনি। স্বামী পালিয়ে চলে যাওয়ার পর সে নিজেই জীবন যুদ্ধে নামেন। তার যুদ্ধ শুধু চাঁদ ও তাঁরার জন্য। কারণ তার বড় মেয়ে শাহানাকে তিনি আগেই অন্যের বাড়ীতে ঝি এর কাজ ও আরেক ছেলে রবিনকে দত্তক দিয়েছিলেন। শাবানার আশ্রয় রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দা চক্ষু হাসপাতাল এলাকায় একটি বাড়ীতে। ওই বাড়ীতে থেকেই সে অন্যের বাসা বাড়ীতে কাজ করা শুরু করে। এভাবেই কেটে যায় ৭ বছর। কিন্তু কখনো জোটেনি সরকারী কোন সাহায্য সহযোগিতা। ৪০ দিনের চাঁদ ও তাঁরার বয়সও এখন ৭ বছর। দুই ভাইয়ের মধ্যে চাঁদ বাক প্রতিবন্ধী। এরপরও শাবানার স্বপ্ন চাঁদ তাঁরাকে শিক্ষিত করা। তাই তিনি চাঁদকে রাজবাড়ী বীরমুক্তিযোদ্ধা খুশি রেলওয়ে ময়দানস্থ প্রতিবন্ধী স্কুলে ও তাঁরাকে শিশু কল্যাণ স্কুলে ভর্তি করেছেন।

সম্প্রতি শাবানা রাজবাড়ী বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ খুশি রেলওয়ে ময়দানে শহীদ দিবস উপলক্ষে বই মেলায় এক পাশে বসে পিঠা বিক্রি করছেন। মেলায় আগতদের মধ্যে শাবানা অন্য এক মানুষ। মেলায় চাঁদ ও তাঁরার মতো অনেক শিশুকে দামী পোষাক পড়ে তার বাবা-মায়ের হাত ধরে আনন্দ চিত্রে ঘুরতে দেখা যায়। কিন্তু চাঁদ তাঁরা তার মায়ের আচঁল তলে বিসন্ন মনে বসে থাকে। শাবানা জানালেন ৩/৪ মাস আগে তার বড় মেয়ের শাহানার বিয়ে হয়ে গেছে। ধার দেনা করে টাকা গুছিয়ে জামাইকে দিয়েছেন। তারপরও সে তার মেয়েকে নির্যাতন করে আরো টাকা এনে দেয়ার জন্য। তবে তার এখন একটাই চিন্তা চাঁদ ও তাঁরাকে মানুষ করা। তিনি সরকারের কাছে মাথা গোঁজার জন্য এক টুকরো জমি ও ঘর দাবী করেন। তার এই আর্তনাত সরকারের প্রতিনিধি বা দায়িত্বশীলদের কানে যাবে কিনা জানি না। খুবই হতাশ লাগে যখন দেখি সরকারী কর্তাদের কাছ থেকে জমিওয়ালারা জমি পাচ্ছে! ঘরওয়ালারা ঘর পাচ্ছে! কিন্তু অসহায় শাবানারা এভাবেই ঘুরছে! প্রত্যাশা করি শাবানার মতো অভাগীদের বাঁচার অবলম্বন হবে। জমি হবে। ঘর হবে।

 

 

আপডেট : শুক্রবার ফেব্রুয়ারী ২০,২০১৫/ ১২:২০ পিএম/ আশিক


এই নিউজটি 1464 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments