‘পিলখানা হত্যা’ দিবস আজ

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ ,২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ | আপডেট: ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ ,২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫
পিকচার

ডেস্ক রিপোর্ট : আজ ২৫ ফেব্রুয়ারী। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় দিন। ২০০৯ সালে এই দিনে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক নৃশংস ঘটনা। সকাল ৯ টা ২৭ মিনিট। ওই দিন দরবার হলে চলমান বার্ষিক দরবারে একদল বিদ্রোহী বিডিআর সৈনিক ঢুকে পড়ে। এদের মধ্যে একজন বিডিআর মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। এরপরই ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা।

বিডিআরের বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে, তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। পুরো পিলখানায় তখন এক ভীতিকর বীভৎস ঘটনার সৃষ্টি হয়। এসময় বিদ্রোহীরা পিলখানার চারটি প্রবেশ গেট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আশে-পাশের এলাকায় গুলি ছুঁড়তে থাকে। তাদের গুলিতে একে একে লুটিয়ে পড়ে মেধাবী সেনা কর্মকর্তারা। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর এ বিদ্রোহের অবসান হয়। পিলখানা পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারী পিলখানা থেকে আবিষ্কৃত হয় গণকবর। গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের লাশ। লাশ আর পিলখানার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে সারাদেশের মানুষ হতবাক হয়ে যায়। ৩৬ ঘণ্টার এ হত্যাযজ্ঞে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দু’জন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ জন বিডিআর সদস্য ও পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রতিরক্ষা-বিধ্বংসী ট্র্যাজেডি কলঙ্কময় পিলখানা বিদ্রোহ।
বিগত মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারী দেশের সূর্যসন্তান মেধাবী সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা, নির্যাতন ও লাশগুমের লোমহর্ষক উত্সবে মেতে উঠেছিল কিছু নরঘাতক।

এ ঘটনায় বিদ্রোহের বিচার হয়েছে। হত্যা মামলায় ১৫৪ আসামীর মৃত্যুদণ্ড ও ১৫৯ জনকে যাবজ্জীবনসহ মোট ৫৭৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। বিস্ফোরক মামলার বিচার চলছে।

বিচারিক আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ আসামীর করা আপিলের শুনানির জন্য হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। বিচারপতি মো: শওকত হোসেন, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মোস্তফা কামাল ইসলামের শিগগিরই শুনানি শুরু হবে।

কিন্তু কেন এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ, এর নেপথ্যে কারা ছিল সেই প্রশ্নের জবাব ও ট্র্যাজেডির নেপথ্যরহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে ফেলা এবং জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের ধ্বংসের এমন ভয়াবহ ঘটনার ষড়যন্ত্রকারীরাও চিহ্নিত হয়নি।

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যের ধারক ও বাংলার সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী ছিল বিডিআর। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। দেশের সীমান্ত রক্ষা, বিদেশি আগ্রাসন ও চোরাচালান প্রতিরোধে এক সাহসী নাম ছিল ‘বাংলাদেশ রাইফেলস’ সংক্ষেপে বিডিআর।

আইন অনুযায়ী সর্বদা বিডিআরের মূল নেতৃত্ব থাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে। সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা সাহসী কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত হয় বিডিআর। সেই বিডিআরকে সেনাবাহিনীর থেকে বিচ্ছিন্ন করার দেশি-বিদেশী ঘৃণ্য চক্রান্তের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছিল বিডিআর বিদ্রোহ।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্তকে করা হয়েছে নিরাপত্তাহীন। দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের টার্গেট করে করে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন। সেদিন সিপাহী মইন, সেলিম রেজা, ইকরাম, কাজল আলী, বাছেদ, জুয়েলসহ বিডিআরের কিছু ঘাতকের হিংস্র তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো।

বিদ্রোহের পর ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আইনের সংশোধন এনে পরিবর্তন করা হয়েছে মনোগ্রাম ও পোশাকেরও। এরই মধ্যে বিদ্রোহের মামলার ৫৭টি ইউনিটের বিচারের সম্পন্ন হওয়ার পর হত্যা মামলারও বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে বিস্ফোরক মামলার বিচার। বিডিআররের নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিন বাহিনীর ৫১ জন সামরিক কর্মকর্তা শহীদ হয়েছিলেন। আর ২০০৯ সালে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র দু’দিনের বিদ্রোহে পিলখানায় ৫৭ জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, দুজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিডিআর জওয়ান, পিলখানার বাইরে সেনাবাহিনীর এক সিপাহী, এক পুলিশ কনস্টেবল ও তিন পথচারী নিহত হয়েছিলেন।

বিদ্রোহের প্রথমদিনেই ২৫ ফেব্রুয়ারিই পিলখানার স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়েছিল ৩ সেনা কর্মকর্তার লাশ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণের পর ২৭ ফেব্রুয়ারি মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া গেছে লাশের স্তূপ। অর্ধশত সাহসী নির্ভীক নিরস্ত্র সেনা কর্মকর্তার সারি সারি লাশ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা দেশের মানুষ।

বর্বর ওই হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, কারা এর অর্থের জোগান দিয়েছে, কারা পরিকল্পনা করেছে, কী তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এসব বিষয় আজও রহস্যাবৃত। বিডিআর হত্যা মামলার রায়েও বিষয়গুলো পরিষ্কার করা হয়নি। ঘটনার পর সেনাবাহিনী থেকে একটি ও সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু ওইসব তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনগুলো আজও প্রকাশ করেনি সরকার।

বিডিআরের নিজস্ব আইনে বিদ্রোহের বিচার ও ফৌজদারি আইনে হত্যা মামলার বিচার। দেশের ৫৭টি ইউনিটের ৬ হাজার ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় বিচার চলে। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছে।

গত ৫ নভেম্বর দেশের ইতিহাসে আলোচিত পিলখানা হত্যা মামলার রায় দেয়া হয়। বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ওই রায়ে মামলায় ৮৪৬ জন জীবিত আসামির মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে ডিএডি তৌহিদসহ ১৫৪ জনকে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৫৯ জনকে।

সর্বনিম্ন ৩ থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর সাজা দেয়া হয়েছে ২৬২ জনকে। এই ২৬২ জনের মধ্যে ২০৭ জনকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের আরেকটি অভিযোগে আরও তিন বছরের সাজা দেয়া হয়। সবমিলিয়ে তাদের মোট কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে ১৩ বছর। অপর ৫৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে ২৭১ জনকে। মামলার মোট ৮৫০ জন আসামির মধ্যে বিচারকার্য চলাকালে ৪ জন আসামি জেলহাজতে মারা গেছেন।

বিদ্রোহীদের হত্যাযজ্ঞ ঘটনায় পুরো বিডিআরের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে যায়। এরপর শুরু হয় বিডিআর পুনর্গঠনের কাজ। বিডিআরের নাম, পোষাক, লোগো, সাংগঠনিক কাঠামো, পদোন্নতি ইত্যাদি ব্যাপারে পুনর্গঠন করা হয়। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পরিবর্তন করা হয় বিডিআর বিদ্রোহের আইন। বর্ডার গার্ড আইনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা রাখা হয় মৃত্যুদণ্ড। এই আইনেই চলছে বিচার। সরকার বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাটিকে ‘পিলখানা হত্যা দিবস’ হিসেবে প্রতি বছর পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। দিবসটি পালন উপলক্ষে পক্ষ এ বছরও বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। আজ দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী শহীদ ব্যক্তিবর্গের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে পিলখানাসহ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর সকল রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরান এবং বিজিবির সকল মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। ২৬ ফেব্রুয়ারী বিকেল সাড়ে ৪ টায় পিলখানায় বীরউত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এই দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিবর্গের নিকটাত্মীয়, পিলখানায় কর্মরত সকল অফিসার, জেসিও, অন্যান্য পদবির সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মচারীগণ অংশগ্রহণ করবেন।

 

 

আপডেট : বুধবার ফেব্রুয়ারী ২৫,২০১৫/ ১০:১৫ এএম/ তামান্না


এই নিউজটি 1124 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments

More News from জাতীয়