ভিক্ষা করতে ভালো লাগে না, তাই বই বিক্রি করি!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৮:১৩ অপরাহ্ণ ,২৫ মে, ২০১৫ | আপডেট: ১:০৪ অপরাহ্ণ ,১৩ আগস্ট, ২০১৫
পিকচার

স্টাফ রিপোর্টার : “বই কিনবেন বই”? বই পড়া ভালো। বই জ্ঞানের আলো। বই কিনবো গাড়ী গাড়ী। বইয়ের একটা হবে বাড়ী। “বই কিনবেন বই”?

সোমবার (২৫ মে) সকালে রাজবাড়ী শহরে এভাবেই ফেরী করে কবিতার বই বিক্রি করছিলো শারীরীক প্রতিবন্ধী ছোট্ট শিশু রাকিব।

দূর থেকে ভেবেছিলাম হয়তোবা ভিক্ষা করছে। কিন্তু যখন হাতে বইগুলো দেখতে পেলাম তখন একটু কৌতুহল হলো তার সন্মন্ধে জানার।

কৌতুহল নিয়েই ডাক দিলাম তাকে। হাতে ক্যামেরা দেখে একটু ভয়ে ভয়ে এগুতে লাগলো। জিজ্ঞেস করলাম ভয় পাচ্ছো কেন ? কি হয়েছে তোমার ? উত্তর দিলো আপনার হাতে ওইটা কি? তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলার পর কথা বলতে রাজি হলো সে ।

সে জানালো, ভিক্ষা করতে ভালো লাগে না, তাই বই বিক্রি করি। এতে যা আয় হয় তা দিয়েই আমাদের দু’জনের সংসার চলে যায়।

সবকিছু বিস্তারিত জানতে চাইলে সে জানায়, তার নাম রাকিব ভূইয়া। বয়স মাত্র ১০বছর। বাড়ী রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাগমারা এলাকায়। তারা দুই ভাই। সে ছোট থাকতে পিতা নয়ন ভূইয়া অন্যত্র বিয়ে করে। এর কিছুদিন পর তার মাও অন্যত্র বিয়ে করে তাকে ছেরে চলে যায়। তখন থেকেই শুরু হয় তার টিকে থাকার লড়াই । বৃদ্ধ দাদা-দাদীর কাছে বড় হতে থাকে সে। এর মধ্যে তার দাদাও মারা যান। দাদা মারা যাওয়ার পর থেকে বৃদ্ধ দাদীকে নিয়েই তার সংসার।

লেখাপড়া সন্মন্ধে জানতে চাইলে রাকিব জানায়, বাগমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র সে। রোল নং-৯। বড় হয়ে পুলিশের চাকুরী করার স্বপ্ন থাকলেও শারীরীক প্রতিবন্ধকতার কারণে যে তা সম্ভব নয় সে বিষয়ে অবগত রাকিব।

তাইতো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগলো, বড় হয়ে আমি চাকুরী করবো। স্বপ্ন ছিলো পুলিশের চাকুরী করবো কিন্তু আমার হাত ভাঙ্গা তো তাই পুলিশের চাকুরী হবে না। তবে এখনও স্বপ্ন আছে ভালো কোন চাকুরী করবো।

হাত কিভাবে ভাঙ্গলো জানতে চাইলে রাকিব জানায়, ছোটবেলায় নারকেল পরছিলো হাতের উপর। তখন থেকেই হাত ভাঙ্গা। দাদা-দাদী টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেনি তাই হাত আর ভালো হয়নি।

রাকিবের ভাঙ্গা হাত দেখে বুঝতে পারলাম। চিকিৎসার অভাবেই হাতটির আজ এই অবস্থা। তবে আমার ধারনা সু-চিকিৎসার মাধ্যমে হাতটি এখনও ভালো করা সম্ভব।

আবার ফিরে গেলাম বই বিক্রি প্রসঙ্গে, রাকিব জানালো প্রতিটি বই সে মুরগীর ফার্ম থেকে ৫টাকা দরে ক্রয় করে এবং তা রাজবাড়ীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে ১০টাকা করে বিক্রি করে। স্কুল বন্ধ থাকলে সারাদিন বিক্রি করে আর স্কুল খোলা থাকলে ছুটির পর বিক্রি করে।

প্রতিদিন কয়টা বই বিক্রি হয় জানতে চাইলে রাকিব জানায়, ঠিক নাই। কোন দিন ১০টা। কোন দিন ১৫টা। এতে যা আয় হয় তা দিয়েই আমার আর দাদীর দু’জনের সংসার কোন মতো চলে।

এ কথাগুলো বলার পরই “দেরী হয়ে যাচ্ছে আমি এখন যাই” বলে চলে যায় রাকিব।

কোন আত্নীয় স্বজনের ফোন নম্বর না দিতে পারায় রাকিবের সন্মন্ধে আর বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। তবে সে নিজের মুখে যে কথাগুলো বলেছে তার একটিও যে মিথ্যা নয় তা তার চোখ-মুখ দেখেই বোঝা গেছে।

এই ডিজিটাল যুগে মানুষের এক দিনের নূন্যতম মোবাইল বিল যখন ৫০টাকা। তখন কবিতার বই বিক্রি করে একদিনের সংসারের বিল ৫০ টাকা গোছাতে ব্যস্ত শিশু রাকিব। কিন্তু ৫০টাকায় কি আর সংসার চলে ??? যেদিন রাকিব বুঝতে পারবে যে ৫০টকায় তার সংসার চলছে না। সেদিন হয়তোবা সে অসৎ পথে টাকা উপার্জন করতে বাধ্য হবে। কারন একজন প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য সৎ পথে টাকা উপার্জন করা অত্যান্ত কষ্টদায়ক।

তাই আসুন অসৎ পথে ধাবিত হবার আগেই আমরা রাকিবের মতো শিশুদের পাশে দাড়াই। তাদের প্রতি একটু সহোযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেই। আমাদের একটু সহযোগীতা,একটু কৃপাদৃষ্টি পেলে রাকিবের মতো শিশুও হতে পারে একজন পুলিশ সদস্য অথবা একজন চাকুরীজিবী।

 

 

 


এই নিউজটি 930 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments