কোটি টাকা মূল্যের সরকারী গাড়ী নিয়ে রাজবাড়ীর সিভিল সার্জনের ভ্রমণ বিলাস : অতপর-দুর্ঘটনা

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৪:২২ অপরাহ্ণ ,২ নভেম্বর, ২০১৫ | আপডেট: ৪:২২ অপরাহ্ণ ,২ নভেম্বর, ২০১৫
পিকচার

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারী নিদের্শনা অমান্য করে ব্যক্তিগত কাজে অফিসিয়াল গাড়ী নিয়ে ভ্রমণ শেষে রাজবাড়ী ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সোয়া কোটি টাকা মূল্যের রাজবাড়ীর সিভিল সার্জনের সরকারী পাজেরো স্পোর্ট (PAJERO SPORT) মডেলের রেজিস্ট্রেশন বিহীন জীপ গাড়ীটি।

জানাগেছে, রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হক গত ৩০শে অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থেকে রাজবাড়ীতে ফেরার পথে জেলার দৌলতদিয়া ফেরী ঘাটের বাইপাস মোড়ে পুলিশ বক্সের সামনে দ্রুতগামী বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে গাড়ীটির সামনে দুমড়ে মুচড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানাগেছে, জেলার কোর অফিসার হওয়া সত্বেও রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হক তার কর্মস্থল ত্যাগ ও সরকারী গাড়ী ব্যবহারের সরকারী আদেশ-নির্দেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে প্রতি সপ্তাহের ন্যায় গত ২৯শে অক্টোবর বিকেলে অবৈধভাবে সরকারী পাজেরো স্পোর্ট গাড়ী নিয়ে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলায় গমন করেন। সেখান থেকে তিনি গত ৩০শে অক্টোবর রাতে রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে সাভারের নবীনগর এলাকার জয় রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তার গাড়ীতে ওঠেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ আরেক অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের এক কর্মকর্তা। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে সিভিল সার্জনের সরকারী গাড়ীটি ফেরী পার হয়ে দৌলতদিয়া বাইপাস মোড়ে পুলিশ বক্সের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা দর্শনা থেকে ঢাকাগামী কোহিনুর পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা-মেট্রো-ব-১১-১৮৭৮)-এর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে গাড়ীর ভেতরে থাকা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হক এবং ওই কর্মকর্তাসহ গাড়ীর চালক মোঃ হাফিজ আলী প্রানে রক্ষা পেলেও সরকারী গাড়ীটির সামনে সামনে দুমড়ে মুচড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাপক ক্ষতি ও ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় সিভিল সার্জনের গাড়ীর পেছনে থাকা একটি প্রাইভেট কারের সহযোগিতায় স্থানীয় লোকজন যাত্রীবাহি বাসটি আটক করে। পরে বাসটি ট্রাফিক পুলিশের সহযোগিতায় হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে যায়।

এরপর সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হকের ফোন পেয়ে সদর হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী মোঃ মোফাজ্জল হোসেন ও এ্যাম্বুলেন্স চালক মাইনুদ্দিন মোল্লা ও আব্দুল্লাহ আল মাসুদ হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স (নিশান) যোগে সুজন মটরস-এর মিস্ত্রী দাউদুল ইসলাম সুজনকে নিয়ে দৌলতদিয়া ঘাটে ঘটনাস্থলে যায়। পরে রাত দেড়টার দিকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চালক মোঃ সেকেন মন্ডল গোয়ালন্দের এ্যাম্বুলেন্স দিয়ে গাড়ীটি টেনে রাজবাড়ীতে এনে সিভিল সার্জন অফিসের গ্যারেজে রাখে। আর সদর হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স যোগে সিভিল সার্জনসহ ওই কর্মকর্তা রাতে রাজবাড়ীতে ফেরেন।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানিয়েছে, গত ৩১শে অক্টোবর সকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কুষ্টিয়া সফরের বিষয়টি জানতে পেরে সিভিল সার্জন সন্ধ্যার পর ত্রিশাল থেকে রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং রাত সাড়ে ১০টায় দৌলতদিয়া ঘাটে তার গাড়ী দুর্ঘটনা কবলিত হয়।

দুর্ঘটনায় সিভিল সার্জনের পাজেরো স্পোর্ট জীপ গাড়ীর সামনের বনেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রেডিওয়াটার ফেটে চ্যাপ্টা, সামনের গ্রীল ভেঙে যায়, প্লাস্টিক বাম্পার অকেজো ও ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেরামত যোগ্য ক্ষতির পরিমান দুই লক্ষাধিক টাকা।

তথ্যানুসন্ধানে প্রকাশ, বিগত ১২/৫/২০১৪ তারিখে সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হক রাজবাড়ীতে যোগদানের পর থেকে সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে (কোন কোন সপ্তাহে ঢাকায় অফিসিয়াল মিটিং-এর অজুহাতে বুধবার বা মঙ্গলবার) তার সরকারী পাজেরো স্পোর্ট জীপ গাড়ী নিয়ে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে যান। ত্রিশাল উপজেলা পরিষদের সামনে তার নিজের ও চাচার মালিকানাধীন “খান ডায়াগনস্টিক সেন্টারে” তিনি ২দিন জমজমাট প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে শনিবার দিনগত গভীর রাতে সেখান থেকে রওনা করে ভোর ৫টার দিকে রাজবাড়ীতে আসেন। আবার কোন দিন সেখান থেকে গফরগাঁও উপজেলায় নিজের ও শ্বশুর বাড়ীতে এবং ফেরার পথে ঢাকায় কন্যার বাসায় গমন করেন। এভাবে প্রতি সপ্তাহে তিনি কমপক্ষে ছয়শত কিলোমিটার করে মাসে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার পথ ডিজেলে পুড়িয়ে ব্যক্তিগত কাজে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করেন। আর এজন্য সরকারী অর্থে গাড়ীর চালককেও ওভার দিতে হচ্ছে মোটা অংকের টাইম। যা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। ইতিপূর্বে ত্রিশালেও এই গাড়ীটি দুর্ঘটনা কবলিত হলে সিভিল সার্জন বিষয়টি ধামাচাপা দেন। গত প্রায় ৭বছর আগে সরকার পাজেরো স্পোর্ট জীপ গাড়ীটি প্রদান করলেও তার রেজিস্ট্রেশন হয়নি?

সুত্র জানায়, ফেরী পারাপারে ফেরীর টিকিট কাউন্টারে ও টিকিটের উপর গাড়ীর নম্বর এন্ট্রি করা হয়। এতে গাড়ীর অবৈধ ব্যবহার ধরা পড়ে। আর রেজিস্ট্রেশন না থাকলে সরকারী নতুন গাড়ী উল্লেখ করে ফেরী পারাপার হয়। সে কারণে সিভিল সার্জন তার গাড়ীর রেজিস্ট্রেশনে আগ্রহী হননি।

সর্বশেষ খবরে জানাযায়, গতকাল ১লা নভেম্বর দুপুর ২টার দিকে সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হকের সাথে তার অফিসে দুর্ঘটনার জন্য দৌলতদিয়া ঘাটে আটক করে রাখা কোহিনুর পরিবহন বাসের মালিক পক্ষের গোপন সমঝোতা হয়। এ সময় সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ আসিফ ও সদরের আরেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে সিভিল সার্জন তার সরকারী গাড়ীর মেরামতের জন্য কোহিনুর পরিবহন বাসের মালিকের কাছে দেড়লক্ষ টাকা দাবী করেন। এ সময় উভয় পক্ষের দীর্ঘ আলোচনায় ৬০হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। বিকেল ৪টার দিকে কোহিনুর পরিবহন বাসের মালিক পক্ষ ৬০হাজার টাকা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হককে প্রদান করে সন্ধ্যার দিকে বাসটি হাইওয়ে পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মাহবুবুল হক ঘটনাটি একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দাবী করলেও বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানান। এ ঘটনায় কোন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন জবাব দেননি।

এ বিষয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় যোগাযোগ করা হলে থানার ওসি এস.এম শাহজালাল জানান, এ দুর্ঘটনায় থানায় কোন মামলা বা জিডি হয়নি।

সিভিল সার্জনের সরকারী গাড়ী ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারকালে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপক গুঞ্জন ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে সিভিল সার্জন সদর হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করছেন বলে জানাগেছে। এতে হাসপাতালের জরুরী রোগী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। সরকারী গাড়ীর অপব্যবহার ও কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের ঘটনা ছাড়াও সিভিল সার্জনের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।

 

(সূত্র – দৈনিক মাতৃকন্ঠ)

 


এই নিউজটি 1262 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments