মুখের ভাষাতে নয়, মনের ভাষাতে এগিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ণ ,২৯ নভেম্বর, ২০১৫ | আপডেট: ৪:৫৭ অপরাহ্ণ ,৩০ নভেম্বর, ২০১৫
পিকচার

আশিকুর রহমান॥ প্রতিবন্ধকতা কারো জন্য বাধা নয়। যদি ইচ্ছা শক্তি থাকে। সেটাই হয়তো করে দেখাতে চাইছে বৃষ্টি। বৃষ্টির ভাল নাম সানজিদা আইরিন বৃষ্টি। ১৪ বছর বয়সী একজন সুদর্শনা কিশোরী সে। যেমনি সুদর্শনা তেমনি মেধাবী। দেখে মনে হয় সৃষ্টিকর্তা যেন নিজ মহিমা দিয়ে অন্য মানুষের থেকে আলাদাভাবে সৃষ্টি করে তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু বৃষ্টির বিষয়ে সবকিছু জানার পর কয়েক মুহুর্তের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কারো কারো অভিমান জন্ম নিতে পারে। কারণ সবকিছু উজার করে দিয়েও সৃষ্টিকর্তা একটি বিশেষ শক্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন বৃষ্টিকে। বৃষ্টির প্রতি সৃষ্টিকর্তার এ নির্মম কৃপনতা অনেকসময় মানুষকে আশ্চর্য হতে বাধ্য করে। প্রশ্ন জাগায় সবকিছু উজার করে দিয়েও কেন সৃষ্টিকর্তা শুধু বাকশক্তি থেকে বঞ্চিত করলো বৃষ্টিকে ?? এরচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো একজন বাক শক্তিহীন কিশোরী হয়েও স্বাভাবিক শির্ক্ষার্থীদের সাথে এবার জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে বৃষ্টি। জেএসসি পরীক্ষায় সবগুলো বিষয়েই নাকি খুব ভালো পরীক্ষাও দিয়েছে সে।

জেএসসি পরীক্ষার শেষ দিন গত ১৮ই নভেম্বর বৃষ্টির পরীক্ষাকেন্দ্র রাজবাড়ী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় বৃষ্টির মা আফরিন মাহ্ফুজা বেনুর সাথে। তখন বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টিও মায়ের পাশে দাড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে মায়ের কথায় সায় দিচ্ছিলেন।

বৃষ্টির মা জানান, তাদের বাড়ী রাজবাড়ী সদর উপজেলার গঙ্গাপ্রসাদপুর গ্রামে । তার স্বামী সামসুল আরেফীন বেসরকারী সংস্থা ব্রাকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে নোয়াখালীতে কর্মরত রয়েছেন। বৃষ্টি তাদের প্রথম সন্তান । জন্ম থেকেই সে বাকপ্রতিবন্ধী। বাকপ্রতিবন্ধী হলেও বৃষ্টি অনেক মেধাবী। তার ইচ্ছা শক্তি অনেক দৃঢ়। আর এ দৃঢ় ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়েই রাজবাড়ী ইয়াছিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে সে। তাদের দ্বিতীয় সন্তানের নাম বাবন। সে ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ে। বৃষ্টির প্রাইভেট পড়ার খরচ মাসে ৩ হাজার টাকা । স্বামী যে বেতন পান তা দিয়ে সংসার চালানো ও বৃষ্টির পড়াশোনা করাতে গিয়ে তাকে হিমসিম খেতে হয়। তাই আদরের মেয়ে বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টিকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করানোর জন্য বাড়ীতে টেইলার্সের কাজ করে এবং টিউশনি করে বাড়তি কিছু অর্থ উপার্জন করেন তিনি।

একজন বাকপ্রতিবন্ধী হয়েও স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের সাথে বৃষ্টির জেএসসি পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বেনু বলেন, বাকপ্রতিবন্ধী হলেও ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টি অনেক মেধাবী। যখন বৃষ্টি ছোট ছিলো তখন আমরা বগুড়ায় থাকতাম । ওইসময় সেখানকার একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে বৃষ্টিকে ভর্তি করে ছিলাম। কিন্তু প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি করার পর বৃষ্টি দিন দিন মানসিকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়ছিলো। এরপর তাকে ওখানকার স্থানীয় একটি প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করার জন্য নিয়ে যাই। আমার মেয়ে প্রতিবন্ধী হওয়ায় ওই স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে স্কুলে ভর্তি করতে আপত্তি করে। অনেক অনুরোধ করার পরে তারা বৃষ্টিকে স্কুলে ভর্তি করলেও প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। সবসময় তারা বৃষ্টির সাথে খারাপ আচরণ করতো। ইচ্ছাকৃতভাবে পরীক্ষায় নম্বর কম দিতো। এ কারণে তাকে রাজবাড়ীতে এনে গঙ্গা প্রসাদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করি। গঙ্গা প্রসাদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে বৃষ্টি ৩.৯৪ পেয়ে পিএসসি পরীক্ষায় পাশ করার পর তাকে ইয়াছিন স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করি। এ কারণে ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টি স্বাভাবিক শিশু-কিশোরীদের মতো চলাফেরা করতে অভ্যস্ত ।

মা হিসেবে বৃষ্টিকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বেনু বলেন, আমার মেয়ে বৃষ্টিকে আল্লাহ্ সব দিক থেকেই উজার করে দিয়েছেন। শুধু বাকশক্তি থেকে আল্লাহ্ ওকে বঞ্চিত করেছেন। ওর জীবনযাপন-চলাফেরা দেখে বোঝার উপায় নেই ও কথা বলতে পারে না। আমার মনের আশা আমি ওকে গ্রাজুয়েট বানাবো। ও একটি সরকারী চাকুরী করবে। সরকারী চাকুরী পাবার পর ভালো ছেলে দেখে ওকে বিয়ে দিবো। আল্লাহ্ অবশ্যই আমার এই স্বপ্নটা পূরণ করবেন।

বৃষ্টির বিষয়ে রাজবাড়ী ইয়াছিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আহমদ ফারুখ জানান, বৃষ্টি অত্যন্ত ভালো এবং সহজ সরল একটি মেয়ে। আমি প্রথম প্রথম ওর আচরণ বুঝতাম না। ও আমাকে সম্মান করে আমাকে কিছু দিতে চাইলে-খাওয়াতে চাইলে আগে আমি সেগুলো গ্রহণ করতাম না। তখন ও খুব অভিমান করতো । এখন আমি ওর মনের ভাষা বুঝতে পারি। সকল ছাত্রীদের মধ্যে বৃষ্টি আমার অন্যতম একজন প্রিয় ছাত্রী। আমি ওকে আমার মেয়ের মতো স্নেহ করি। বৃষ্টিও আমাকে অনেক সম্মান করে। বৃষ্টিকে নিয়ে ওর মা-বাবা যে স্বপ্ন দেখেন তা অবশ্যই পূরণ হবে। কারণ বৃষ্টির মধ্যে সে সম্ভাবনা আছে। আমি আশাবাদী এবারের জেএসসি পরীক্ষাতেও বৃষ্টি ভালো রেজাল্ট করবে। মুখের ভাষাতে নয়, মনের ভাষাতে বৃষ্টি এগিয়ে যাবে তার চুড়ান্ত লক্ষ্যে।

সব পিতা-মাতাই চায় তার সন্তানের জীবনে সফলতা আসুক। বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টির পিতা-মাতার চাওয়াটাও তার থেকে ব্যতিক্রম নয়। ব্যতিক্রম শুধু বৃষ্টির প্রতিবন্ধকতা। যে সব দিক থেকে একজন পুরিপূর্ণ সুস্থ্য মানুষ হয়েও শুধু কথা বলার শক্তি নেই বৃষ্টির। বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টি যেন একজন ভালো সরকারী চাকুরীজীবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পিতা-মাতার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে এটাই “রাজবাড়ী নিউজ ২৪.কম” পরিবারের প্রত্যাশা।

 


এই নিউজটি 1902 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments