‘প্রথমবার ভোট দিবো, তাও আবার দলীয় প্রতীকে’

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ ,২২ ডিসেম্বর, ২০১৫ | আপডেট: ৫:৩২ অপরাহ্ণ ,২২ ডিসেম্বর, ২০১৫
পিকচার

আশিকুর রহমান॥ ‘ছোটবেলায় দেখতাম বাবা-মা আগে থেকে আলাপ আলোচনা করে সিন্ধান্ত নিয়ে পছন্দের প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে যেতেন। তখন আমিও কল্পনা করতাম কবে আমি ভোট দিতে পারবো। এতোদিন পর আমার সেই কল্পনা বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে। এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিবো, তাও আবার দলীয় প্রতীকে। ভেবেই অনেক আনন্দ হচ্ছে।’

আগামী ৩০শে ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনে জীবনের প্রথম ভোট দিবেন এ আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রাজবাড়ী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের নতুন ভোটার গোলাম মওলা রিমন। শুধু রিমনই নয় রাজবাড়ী পৌরসভায় এমন অনেক নতুন ভোটার রয়েছেন যাদের কাছে প্রথম ভোট দেওয়ার বিষয়টি ‘বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে যাওয়ার মতো’।

৩০শে ডিসেম্বর দেশের ২৩৩টি পৌরসভার মতো রাজবাড়ী পৌরসভায়ও অনুষ্ঠিত হবে পৌর নির্বাচন। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে প্রার্থীদের প্রচারণার লড়াইও ততই জমে উঠছে। মেয়র প্রার্থীরা পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে নিজ নিজ গণসংযোগে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। পুরুষ ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন নিজেদের যোগ্যতার কথা। গণসংযোগে মেয়র প্রার্থীদের চেয়ে কাউন্সিলর প্রার্থীরাও কোন অংশে পিছিয়ে নেই। তারাও নিজ নিজ ওয়াডের্র প্রতিটি মহল্লায় গিয়ে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। লক্ষ্য একটাই ৩০ডিসেম্বরের নিবার্চনে বিজয় অর্জন।

রাজবাড়ী পৌর নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি থেকে পৃথকভাবে তিনজন মেয়রপ্রার্থী নির্বাচন করছেন। এছাড়াও পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৩৫জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন ১১জন প্রার্থী। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচন হওয়ায় প্রার্থীদের মধ্যেও বিরাজ করছে বাড়তি উদ্দীপনা। প্রত্যেকেই নিজ দলীয় প্রতীক নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অপরদিকে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দীর্ঘ ৭বছর পর দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে যাচ্ছেন রাজবাড়ীর ভোটাররা। এ আনন্দটাও ফুটে উঠেছে সব বয়সী ভোটারদের চোখেমুখে। PIC_01

রাজবাড়ী পৌর নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার জন্য সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কাজী কেরামত আলীর ভাই জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কাজী ইরাদত আলী কয়েকদিন ব্যাপক হারে প্রচার-প্রচারনা চালালেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন পাননি তিনি। মনোনয়ন পেয়েছেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য কামরুন নাহার চৌধুরী লাভলীর স্বামী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মহম্মদ আলী চৌধুরী। মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষোভে কাজী ইরাদত আলী দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারনা করছেন না, কয়েকদিন এমন গুঞ্জন শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা মিথ্যা বলে প্রমানিত হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনী প্রচানায় মেয়র প্রার্থী মহম্মদ আলী চৌধুরীর সঙ্গে সার্বক্ষনিক কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করছেন ইরাদ আলী। ইতিমধ্যে মহম্মদ আলী চৌধুরী তার নির্বাচনী ইস্তেহারও ঘোষণা করেছেন।

আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী মহম্মদ আলী চৌধুরী বলেন, প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচন হচ্ছে। নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে পারাটা আমার জন্য একটা সৌভাগ্যের বিষয়। এরআগে আমি একটানা ৬বছর রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র ছিলাম। তখন আমি পৌরসভার অনেক উন্নয়ন করেছি। সেসব উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের কথা স্মরণ করে পৌরবাসী নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে আমাকে আবারো তাদের সেবা করার সুযোগ করে দিবেন। আমি এবার নির্বাচিত হয়ে রাজবাড়ী পৌরসভাকে মডেল পৌরসভা হিসেবে গড়ে তুলবো।

মহম্মদ আলী চৌধুরী দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও স্বাধীনতার পর নিকট অতীতে মাত্র একবারই মেয়রপদটি দখলে রাখতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ। ২০০৪ সালের সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহম্মদ আলী চৌধুরী বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আলম দুলালকে পরাজিত করেছিলেন। এখন দেখার বিষয় রাজবাড়ী পৌরবাসীর কতটুকু আস্থা রয়েছে সাবেক এই পৌর মেয়রের প্রতি।PIC_04

অপরদিকে, গত ২০১১ সালের পৌর নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া মেয়র নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর কাজ করলেও এবার দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি তাকে। বিএনপি থেকে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন রাজবাড়ী পৌরসভার ৩ বারের নির্বাচিত মেয়র ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের বড় ছেলে এবং পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য তরুণ অর্ণব নেওয়াজ মাহমুদ হৃষিত। জানাগেছে মেয়র ও সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে হৃষিতের বাবা আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের জনপ্রিয়তা ছিলো তুঙ্গে। বাবার সেই জনপ্রিয়তা ও কর্ম দক্ষতার কথা স্মরণ করে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে পৌরবাসী তাকে (হৃষিত) নির্বাচিত করবেন বলে মনে করছেন ২৯বছর বয়সী এ নওজোয়ান। পিতার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে পৌর মেয়র হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও বয়স কম হওয়ায় এ যুবককে নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী অর্ণব নেওয়াজ মাহমুদ হৃষিত বলেন, রাজবাড়ী পৌরসভা অনেক পিছিয়ে আছে। নারী উন্নয়নে আমার বাবা যে কাজ করে এসেছে আমিও তাই করবো। রাজবাড়ীতে যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে সবই আমার বাবার হাতে করা। রাস্তা ঘাট, মসজিদ, মন্দির, ড্রেন, বিদ্যুৎ, শিক্ষাসহ সব কিছুই আমার বাবার হাতের। পৌরবাসী আমার বাবাকে ভালবেসে প্রথমবার ৫’শ ভোটে বিজয়ী করেছিলেন। পরের বার বিজয়ী করেছিলেন ৫ হাজার ভোটে । পৌরবাসী এবার ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে আমাকেও বিপুল ভোটে বিজয়ী করবেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও রাজবাড়ী পৌর নির্বাচনে এবার জাতীয় পার্টি থেকে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন পৌর জাতীয় পার্টির অন্যতম সদস্য শুকুর চৌধুরী। রাজনীতি ছাড়াও শুকুর চৌধুরী ঠিাকাদারী ব্যবসা এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

শুকুর চৌধুরী বলেন, এবারের পৌর নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে। সে কারনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই নির্বাচন হবে অগ্নিপরীক্ষা। এই নির্বাচন যদি সরকার দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারে তাহলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে না। সরকার যদি প্রভাব খাটিয়ে এ নির্বাচন তাদের পক্ষে নেয় তাহলে জনগন ক্ষমতাসীন দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং তারা জনগনের কাছ থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়বে। তাই যদি এই নির্বাচন নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত হয় তাহলে আমি লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হবো।

জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী হলেও ইতিপূর্বে একাধিকবার মেয়র প্রার্থী হিসেবে পৌর নির্বাচন করে বিশাল ব্যবধানে পরাজয় বরণ করে জামানত হারিয়েছেন মোঃ শুকুর চৌধুরী।PIC_03

এদিকে, দীর্ঘ ৭বছর পর নিজেদের পছন্দের দলের প্রতীকে ভোট দিতে যাচ্ছেন পৌরবাসী। কারণ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় এবং বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হওয়ায় দলীয় প্রতীকে ভোট দেওয়ার সাধটা অপূর্ণ থেকে যায় ভোটারদের। তাই আগামী ৩০শে ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে পারবেন বলে ভোটারদের মধ্যেও বিরাজ করছে বাড়তি আনন্দ।

পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোঃ হেলাল উদ্দিন সরদার বলেন, পছন্দের দলীয় প্রতীকে সর্বশেষ ভোট দিয়েছিলাম ২০০৮ সালে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় তখন ভোট দিতে পারিনি। ৭বছর পর দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে পারবো এটা ভেবে অনেক আনন্দ লাগছে।

পৌর নির্বচনকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ী পৌরসভায় এখনও পর্যন্ত কোন অপ্রিতীকর ঘটনা ঘটেনি। বিগত সময় দেশের রাজনৈকি পরিস্থিতি যখন অত্যান্ত নাজুক ছিলো তখনও রাজনৈতিক বিরোধ ও প্রতিহিংসা ভুলে গিয়ে একত্রিত হয়ে কাজ করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন রাজাবাড়ীর শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আসন্ন ৩০ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হবে বলে মনে করছেন সচেতনমহল।

রাজবাড়ী পৌরসভার মোট ভোটার সংখ্যা ৩৮হাজার ৮১৯জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৯হাজার ১৪৬জন ও মহিলা ভোটারের সংখ্যা ১৯হাজার ৬৭৩জন।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি – মেয়র যে দলেরই হোক না কেন শান্তিপ্রিয় রাজবাড়ী পৌরবাসী চান পৌরসভার উন্নয়ন। এখন দেখার বিষয় কে হতে যাচ্ছেন রাজবাড়ী পৌরসভার উন্নয়নের রুপকার।

 

আপডেট : সোমবার ডিসেম্বর ২১, ২০১৫/ ১১:৫৫ পিএম/ এফকে


এই নিউজটি 1000 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments