স্বামীর নির্যাতনের শিকার মারিয়া এখন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৭:৩৮ অপরাহ্ণ ,১৪ জানুয়ারি, ২০১৬ | আপডেট: ৮:০১ অপরাহ্ণ ,১৪ জানুয়ারি, ২০১৬
পিকচার

বিশেষ প্রতিবেদক : কিশোরী বয়সে প্রতিটি মেয়েই স্বপ্ন দেখে একদিন তার স্বামী হবে, সন্তান হবে, রঙিন সংসার হবে। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে মারিয়াও ঠিক এমন স্বপ্নই দেখেছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রঙিন সংসার জীবন পাওয়া হয়নি মারিয়ার। যৌতুক নামক একটি শব্দ কেড়ে নিয়েছে তার সকল স্বপ্ন। মাদকাসক্ত স্বামীর দাবীকৃত যৌতুক মিটাতে ব্যর্থ হয়ে মাসের পর মাস নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে। নির্যাতনের শিকার থেকে মুক্তির আশায় অবশেষে মারিয়া স্বামীর সংসার থেকে লোকালয়ে এসেছে ঠিকই। কিন্তু ততদিনে তার দেহে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধী ব্লাড ক্যান্সার।

অর্থাভাবে মারিয়া যখন বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিল তখন ‘অধিকার’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন মারিয়ার পাশে দাড়িয়ে তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

২২ বছর বয়সী মারিয়ার পুরো নাম মারিয়া বেগম। রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার চর ফরিদপুর গ্রামের দিনমজুর আজাহার জোয়ার্দ্দারের মেয়ে সে।

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাঁতরানো অবস্থায় মারিয়া জানান, সংসারে অভাব-অনটন থাকার কারণে তার বাবা মাত্র ১৬বছর বয়সে তাকে বালিয়াকান্দি উপজেলার বেতেঙ্গা গ্রামের আঃ গফুরের ছেলে নসিমন চালক রাসেল মোল্লা (২৫) এর সাথে বিয়ে দেন। বিয়ের সময় মারিয়ার বাবার বাড়ি থেকে রাসেলকে উপহার হিসেবে নগদ ২০ হাজার টাকা, স্বর্ণের কানের দুল ও স্বর্ণের চেইন দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পড়েই মাদকাসক্ত রাসেল নেশা করে ওই টাকা নষ্ট করে ফেলে। এরপর সে মারিয়াকে আবারো তার বাবার বাড়ি থেকে যৌতুক বাবদ টাকা এনে দিতে বলে। মারিয়া টাকা আনতে অস্বীকার করলে রাসেল মারিয়ার উপরে অমানুষিক নির্যাতন চালাতে শুরু করে। স্বামীর সংসারে নির্যাতন সহ্য করে থাকা অবস্থায় বিয়ের বছর দুই পরে মারিয়ার কোলে আসে এক পুত্র সন্তান। তার নাম রাখা হয় রাজু। রাজুর বয়সও এখন ৪বছর। পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করার পরও মারিয়ার উপর নির্যাতন থেমে থাকেনি। স্বামী রাসেলের সাথে তাল মিলিয়ে নির্যাতন করেছে পরিবারের অন্য সদস্যরাও। শুধু তাই নয় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বহু বার। কিন্তু বার বারই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে মারিয়া ফিরে গেছে স্বামীর সংসারে। এভাবেই মারিয়া অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছে দীর্ঘ ৬টি বছর।

সর্বশেষ গত ২৬ সেপ্টেম্বর মারিয়াকে নির্যাতন করে শিশু সন্তানকে রেখে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় শ্বশুর বাড়ির লোকজন। নিরুপায় হয়ে মারিয়া তার হতদরিদ্র পিতার কাছে এসে আশ্রয় নেয়। সেখানেই স্থানীয় ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছিল মারিয়া। কিন্তু ক্রমশই বেশী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে গত ৫জানুয়ারী রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ভর্তি হয় মারিয়া। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে বেড না পাওয়ায় মারিয়ার স্থান হয় ফ্লোরে।

হাসপাতালের ফ্লোরে অনেকটা অবহেলায় পড়ে থাকার ৩দিন পর রাজবাড়ীর সামাজিক সংগঠন ‘অধিকার’ এর একদল তরুণ তার পাশে দাঁড়ায়। তাদের কাছে মারিয়া নিজের উপর বয়ে যাওয়া নির্যাতনের কথা বর্ণনা করে। মারিয়ার কাছ থেকে কথা শোনার পর ওই তরুণরা সদর হাসপাতালের আরএমও ডাঃ আব্দুল হান্নানের সাথে আলাপ করে। ডাক্তার আব্দুল হান্নান তাদেরকে কয়েকটি টেস্ট করার জন্য লিখে দেন। এরপর মারিয়াকে তারা নিজ খরচে ফরিদপুর থেকে পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে আসে। তখনও মারিয়া জানতে পারেনি তার কি হয়েছে। আসলে তাকে জানতেও দেয়া হয়নি তার কি হয়েছে। কারণ মারিয়ার দেহে বাসা বেধেছে মরণব্যাধী ব্লাড ক্যান্সার। চিকিৎসক সামাজিক সংগঠন ‘অধিকার’ এর সদস্যদের জানিয়েছেন মারিয়ার শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়েছে এটা বললে ওকে বেশীদিন বাঁচানো যাবে না। তাই তার কাছে বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে।

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের আরএমও ডাঃ আব্দুল হান্নান জানান, মারিয়া ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। এ রোগে মানুষ বেশী দিন বাঁচে না। আবার কেউ কেউ ৭/৮ বছর পর্যন্ত বাঁচে। তবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারলে ব্লাড ক্যান্সার ভালো করা যায়। কিন্ত এর জন্য খরচ হবে ৮০লক্ষ টাকা।

সামাজিক সংগঠন ‘অধিকার’ এর কর্মী রমেন, পাপ্পু, সোহান, জাহাঙ্গীর, রকি ও শাওলিন বলেন, আমরা নির্যাতিতা মারিয়ার মুখ থেকে সব কথা শোনার পর ওর পাশে দাঁড়িয়েছি। ওর ওষুধ থেকে শুরু করে যা প্রয়োজন তা আমরাই করছি। আমরা মারিয়াকে বাঁচাতে চাই। দুই এক দিনের মধ্যেই মারিয়াকে আমরা ঢাকায় হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করবো।

তারা মারিয়াকে বাঁচানোর জন্য সমাজের বিত্তবান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষকে পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহবান জানিয়েছেন।

মৃত্যু পথযাত্রী মারিয়ার এখন শুধু একটাই চাওয়া সমাজের কোন মেয়ের যেন তার মতো এমন করুণ পরিণতি না হয়। আর কোন বাবা-মা যেন তাদের মেয়েকে কম বয়সে বিয়ে না দেয়।

তবে মারিয়া তার যৌতুকলোভী স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের বিচার চায়। এ কারণে সে বালিয়াকান্দি থানায় স্বামী রাসেল মোল্লা, শ্বশুর আঃ গফুর ও শ্বাশুরী সাফিয়া বেগমকে আসামী করে মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) নারী নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধনী/০৩) এর ১১(গ)/৩০ধারায় মামলা দায়ের করেছে।

এ মামলার প্রেক্ষিতে বুধবার (১৩ জানুয়ারি) রাত ১২টার দিকে মারিয়ার স্বামী রাসেল ও শ্বশুর আঃ গফুরকে গ্রেফতার এবং মারিয়ার শিশু পুত্র রাজুকে উদ্ধার করে বালিয়াকান্দি থানার পুলিশ।

 

আপডেট : বৃহস্পতিবার জানুয়ারি ১৪, ২০১৬/ ০৭:৩৫ পিএম/ শিহাবুর রহমান/ ফকীর আশিকুর


এই নিউজটি 1116 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments