প্রতিবন্ধী মা-ছেলের করুণ কাহিনী!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১০:২৫ অপরাহ্ণ ,২০ জানুয়ারি, ২০১৬ | আপডেট: ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ ,২১ জানুয়ারি, ২০১৬
পিকচার

আশিকুর রহমান : মা-ছেলে দু’জনেই প্রতিবন্ধী। নিজস্ব কোন ঘর বাড়ি নেই তাদের। বসবাস করার নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকলেও সেখানে থাকতে পারেন না তারা। পেটের তাগিদে তাদেরকে ছুটে চলতে হয় দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। ছুটে চলার মাঝে যেখানে রাত হয়, সে স্থানই হয় তাদের রাত্রি যাপনের আশ্রয়স্থল। অনেকটা ‘যেখানে রাত, সেখানেই কাত’ প্রবাদ বাক্যের মতো।

বর্তমানে তীব্র শীত ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা আশ্রয় নিয়েছেন রাজবাড়ী জেলা সদরের বসন্তপুর রেল স্টেশনে। কয়েকদিনের জন্য এ স্টেশনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে শারীরিক প্রতিবন্ধী হামিদুল ইসলাম (৩৫) ও তার মা বাক প্রতিবন্ধী জামেনা বেগম (৬০) এর সংসার। বর্তমানে প্রতিবন্ধী হলেও একসময় তারা সুস্থ্য ছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তারা প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধকতার কারণে সংসার জীবন টেকেনি হামিদুলের।

এ ছাড়াও মা-ছেলের জীবনে রয়েছে অনেক করুণ কাহিনী। এ করুণ কাহিনী ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ এর পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্য বুধবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে এ প্রতিবেদক ছুটে যান বসন্তপুর রেল স্টেশনে। স্টেশন ঘরের পাশে খোলা জায়গায় ছোট্ট পাতিলে করে খিচুরি রান্না করছিলেন মা-ছেলে।

এ সময় কথা হয় শারিরীক প্রতিবন্ধী হামিদুলের সাথে। মা জামেনা বেগম বাক প্রতিবন্ধী হওয়ায় কথা বলতে না পারলেও মাথা নারিয়ে ছেলের কথায় সায় দিচ্ছিলেন।

হামিদুল ইসলাম জানান, তার পৈতিৃক বাড়ি বগুরা জেলার আদমদীঘি উপজেলার শান্তাহার ইউনিয়নে। তার বয়স যখন দুই বছর তখন তার বাবা আমজাদ ইসলাম মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তাকে কোলে নিয়ে শুরু হয় তার মা জামেনা বেগমের জীবন যুদ্ধ। স্বামীর মৃত্যুর শোকে জামেনা বেগম আস্তে আস্তে তার বাক শক্তি হারিয়ে ফেলেন।  এরপর শিশু পুত্রকে কোলে নিয়ে সে ভিক্ষাবৃত্তি করে দিনযাপন করতে থাকেন। ভিক্ষা করার সময়ে আব্দুর রাজ্জাক নামে এক ভিক্ষুকের সঙ্গে পরিচয় হয় জামেনা বেগমের। সেই রাজ্জাকের হাত ধরেই শিশু পুত্রকে কোলে নিয়ে ভিক্ষা করতে করতে রাজবাড়ী রেল স্টেশনে এসে আশ্রয় নেন জামেনা। তখন থেকে রাজবাড়ীকেই নির্দিষ্ট আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন জামেনা। রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষা করে শিশু পুত্র হামিদুলকে নিয়ে বসবাস করতে থাকেন তিনি। এরমাঝে তার ভাগ্যে আসে আরেক দুঃখ। অসাবধানতা বশত চুলার আগুন থেকে ছেলে হামিদুলের ডান হাতের অনেকাংশ পুরে যায়। অর্থাভাবে সু-চিকিৎসা করাতে না পারায়
হামিদুলের সেই হাত আজ পঙ্গু।

চোখে-মুখে হতাশা নিয়ে হামিদুল বলেন, ‘বুদ্ধি হওয়ার পর থেইকাই দেখতিছি মা কথা কইব্যার পারে না। আমারে নিয়্যা মা ভিক্ষ্যা করতো। ছোটকালে মাঝে মাঝে বগুড়া জেলার ধুপচাঁচিয়া উপজেলা তালোরা গ্রামে নানা বাড়ি যাইতাম। নানীর কাছ থেইক্যা যেই গল্প হুনছি হেইড্যাই আপনেরে কইলাম।’

হামিদুল বলেন, ‘ইটু বড় হওয়ার পর রাস্তা-ঘাটে ভাংগারী টুহাইতাম। এছাড়াও যে কতো কষ্টের কাম করছি এহন মনে নাই। সবশেষে তিন বছর আগে ভ্যান গাড়ি চালাইতাম। কিন্তু গাড়ি ডা চুরি হইয়্যা যাওয়ার পর থেইক্যা আবার ভিক্ষ্যা করি। অনেকে অনেক কথা কয়। কিন্তু কি করবো? এক হাত দিয়্যা ভারি কোন কাম করব্যার পারি ন্যা। যহন ভ্যান ছিল, কর্ম ছিল। এক হাত দিয়্যা ভ্যান চালাইয়্যা সংসার চালাইতাম। প্যাটের দুঃখে এহন মা রে নিয়্যা দ্যাশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুইড়্যা ঘুইড়্যা ভিক্ষ্যা করি। চুরি তো আর করি ন্যা।’

ভ্যান গাড়ি কিভাবে হারালো জানতে চাইলে হামিদুল বলেন, ‘তিন বছর আগে অনেক কষ্টে ভ্যান গাড়ি ডা কিনছিলাম। একদিন রাজবাড়ী রেলগেট এলাকায় ভ্যান রাইখ্যা প্রসাব করব্যার গিছি। আইস্যা দেহি ভ্যান নাই। এরপর থেইকাই ভিক্ষা করি।’

বিয়ে সাদী করেছেন কি না জানতে চাইলে হামিদুল বলেন, ‘এ আরেক দুঃখের কথা। দুই বছর আগে পোড়াদহ ইউনিয়নে বিয়্যা করছিলাম। কিন্তু বউ রে মানুষ ফুসলাইয়্যা আমার থেইক্যা আলাদা কইর্যা দিছে। মানুষ বউ রে কইতো – তুই এতো সুন্দর মাইয়্যা হইয়্যা এই প্রতিবন্ধীর লগে সুংসার করস ক্যা ? আরও ম্যালা কথা। পরে বিয়্যার এক মাস পরেই বউ তালাক দিয়্যা চইল্যা গিছে।’

হামিদুল ও তার মা’য়ের রাজবাড়ী শহরের হরিসভা এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেওয়া রয়েছে। কিন্তু পেটের তাগিদে ওই বাসায় থাকতে পারেন না তারা। বলা চলে পুরো মাসই তাদেরকে থাকতে হয় রাস্তা-ঘাটে। বগুড়া জেলায় হামিদুলের বাবার বাড়িতে কে কে আছে? সেখানে তার বাবার কোন জমিজমা আছে কি না? এসব কিছুই বলতে পারেন না হামিদুল।

এ বিষয়ে হামিদুল বলেন, ‘বাসা নিছি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট এটা ঠিাকানা রাহার জন্যি। মাঝে মাঝে ওই বাসায় যাই, দুই একদিন থাহি। আবার ভিক্ষা করার জন্যি বিভিন্ন জাগায় ছুইট্য বেড়াই। বাসায় বইস্যা থাকলি তো আর প্যাটে ভাত যায় না। আর বগুড়ায় আমার আব্বার বাড়ি কি আছে আমি জানি ন্যা। কোনদিন যাই ন্যাই সেইহানে।’

ভবিষ্যত কি করবেন জানতে চাইলে হামিদুল বলেন, ‘ভিক্ষ্যা করতে ভাল লাগে না। কর্ম কইর্যা খাইব্যার চাই। আবার বিয়্যা-সাদী করব্যার চাই। কিন্তু কোন কিছুই কইর‌্যা উঠপ্যার পারতিছি ন্যা। ভ্যান ডা যদি ফেরৎ পাইতাম তাইলে সংসার সাজাইবার পারতাম।’

তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মানুষের চাওয়া পাওয়ার যেখানে শেষ নেই। সেখানে প্রতিবন্ধী হামিদুলের একমাত্র চাওয়া একটি ভ্যান। আমরা জানি তার হারানো ভ্যান আর ফেরৎ পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে হামিদুল অবশ্যই একটি নতুন ভ্যান পেতে পারেন। পূরণ করতে পারেন তার লালিত ছোট ছোট স্বপ্নগুলো।

হামিদুলের এ করুণ কাহিনী পড়ে একটি ভ্যান গাড়ি কেনায় সহযোগীতা করার জন্য সমাজের বিত্তবানদের মধ্যে থেকে কেউ এগিয়ে এসে হামিদুলের স্বপ্ন পূরণ করবেন এটাই ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ পরিবারের প্রত্যাশা।

 


এই নিউজটি 1224 বার পড়া হয়েছে
[fbcomments"]