,

আমাদের শান্ত স্যার; আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর |মির্জা মোহাম্মদ কর্নেল

News

জনাব নুরুল ইসলাম (শান্ত)। আমাদের আমলের এ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। আমরা তাকে এ্যসিস্ট্যান্ট স্যার বলে ডাকতাম। আমি যখন কৈশরের দুরু দুরু বুক ও অসীম স্বপ্ন নিয়ে ক্লাস ভাইভ থেকে ১ম হয়ে রাজাপুর ইয়াছিন ইন্সটিটিউশন-এ ভর্তি হলাম ১ম দিনেই স্যার এর সাথে দেখা হয়েছিল। উনার সম্পর্কে আগেই আমার জানা ছিল। ভাইয়া প্রতি ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে এসেছেন-সেই সুবাদে আমাদের পরিবারের সাথে উনার জানাশোনা ছিল।

শান্ত স্যার আমাদের বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন। ক্লাসে খুব মজা করে পড়াতেন। আমাদের প্রচুর লিখতে দিতেন; রচনা, ভাব-সম্প্রসারণ, সারাংশ-সারমর্ম। গ্রামে মুখস্ত বিদ্যার পাশাপাশি উনার দেয়া প্রাকটিসগুলি আমাদের আমাদের লেখার হাত তৈরীতে খুব  সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। দারুন দারুন গল্প বলা ছিল উনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিদেশী সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্হা সব কিছুতেই উনার ভাল দখল ছিল।প্রাক যৌবনে আমাদের মাথায় সাহিত্য ও রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়েছে এই অগ্রদুতের হাত ধরেই।

স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, একুশে ফেব্রুয়ারী, বিদায় দিবস সব তিনি নিজে নিজে পরিকল্পনা করতেন যাতে করে আগের বছরের চেয়ে পরের বছর আরো ভাল অনুষ্ঠান হয়। আমাদের বিদায় দিবসে উনি আমাকে উপস্থাপনার দায়িত্ব দিলেন। হাঁটু ও গলার যৌথ কম্পনে সেই আমার উপস্থাপনার হাতে খড়ি। আমি জানি ঐদিন আমার  কথার মাঝে অলংকার দিতে পারিনি, দিতে পারনি রুপক। তবু, আজ যখন উপস্থাপনার হাততালি পাই, স্যারকে খুব মনে পড়ে।

স্যার খুব কড়া ছিলেন। নামে শান্ত হলেও স্যার শান্ত ছিলেন না। উনাকে পিছনে ‘বাঘ শান্ত’ নামে ডাকা হত। তাঁর জোড়া বেতেরবারি খুব বিখ্যাত ছিল। ক্লাস ফাঁকি, মারামারি, মেয়েঘটিত ব্যাপার স্যাপারে উনি শুরতেই এমন পিটানি দিতেন যা বাকী সবার কাছে নজির হয়ে থাকত। বলা ভাল, রাজবাড়ী জেলার সব শেষের গ্রামের বুড়ো-দামড়া ও বাচ্চা ছেলেকে শুধু আদর করে মানুষ করা খুব সম্ভব ছিলনা বলেই স্যার হাতে বেত তুলে নিয়েছিলেন বলে আমার মনে হয়েছে। রাজবাড়ীতে রাজাপুর ইয়াসিন ইনস্টিটিউশন এখন নামকরা স্কুল এবং নামকরা স্কুল হওয়ার অবদান শান্তু স্যার এর ই বেশী।

আমি যখন ক্লাস টেন এ পড়ি আমার রোল ২ থেকে ৪ হয়। আমি তখন ইয়ার দোস্ত ছাড়া চলতেই পারি না, একটা মেয়েকে দেখলে আমার মনে মাঝে ঝমঝম করে মেঘ-বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়, টিফিন প্রিয়ডে নিয়ম করে স্কুলের পাশের গ্রামে তরমুজ, ফুটি, আম, জাম খেতে যেতাম ইয়ার দোস্তদের নিয়ে। তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝি, আমি আসলে বখে যাচ্ছিলাম। তো স্যারের নজরে পড়ে গেলাম। স্যার আমাকে অন্যান্য স্যারদের নিয়ে লাইব্রেরী রুমে বসলেন। আমাকে সবক দেয়া হল মন দিয়ে পড়া লেখা করার, বাজে বন্ধু থেকে দুরে থাকার। একদিন সেই কারনেই কিনা লঘু পাপে গুরুদন্ড দিলেন। দুইহাতে দুই বেতের বারি, তাও দেড় হাত বেতের সামনের ইঞ্চি চারেক দিয়ে। আজ এতদিন পর মনে পড়ে, তার পর থেকেই আমি অনেক সাবধান হয়ে ছিলাম। আমার এসএসসির রেজাল্ট ও ভাল ছিল-আমি আবার সেকেন্ড হয়েছিলাম। দোস্ত ডিএম শাহীনের জন্য সারা স্কুলজীবন রোল নং ১ বরাদ্দ ছিল।

স্যার এখন অবসর গ্রহন করেছেন। সফেদ সাদা দাঁড়ি নিয়ে রাস্তার পাশ দিয়ে যখন তিনি হেঁটে যান আমাদের পাড়া গাঁয়ের পথ ধরে, উনাকে আমার একজন দেবদূত বা রুপকথার চকলেটওয়ালা দাদাভাই বলে মনে হয় এখনও।

স্যালুট আমাদের প্রিয় শান্ত স্যার ! আপনি একজন আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর।

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর