লাজ ভাঙানোর ফেরিওয়ালা!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১২:৩১ অপরাহ্ণ ,১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ | আপডেট: ১:৩৭ অপরাহ্ণ ,১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
পিকচার

ফকীর আশিকুর রহমান : রাজধানীর ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোড। ভিন্নধর্মী একটি ভ্যান গাড়ি ও গাড়ির মালিককে দেখে চোখ আটকে যাবে। মালিকের পড়নে দামী শার্ট-প্যান্ট, দেখতেও সুদর্শন। গলায় ডিএসএলআর ক্যামেরা। প্রথমে ভাবতে পারেন ভীনদেশী কোনো পর্যটক বাংলাদেশে ঘুরতে এসে শখের বসে মজা করে ভ্যান গাড়ি চালাচ্ছেন। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে যুবকটি স্বদেশী।

উচ্চবিত্ত পরিবারের ২৯ বছর বয়সী শিক্ষিত এ যুবকের নাম লিখন তাজুল। দীর্ঘসময় কাটিয়েছেন সাউথ কোরিয়ায়। অথচ এখন ভ্যান গাড়ি নিয়ে ব্যবসা করতে রাস্তায় নেমেছেন। তার ভ্যান গাড়িতে রয়েছে কলেজ ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্ট, সানগ্লাস, স্যান্ডেল, টি-শার্ট, ক্যাপসহ বিভিন্ন রকমের পণ্য সামগ্রী। ভ্যান গাড়িতে করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় এসকল সামগ্রী বিক্রি করেন লিখন। তিনি এ ভ্যান গাড়িটির নাম দিয়েছেন ‘ড্রিম ভ্যান’।

শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়েও কেন এ কাজ করছেন? উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়ে এ ধরণের কাজ করতে লজ্জা লাগে না? উত্তরে লিখন বললেন, ‘নিজের স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করছি, এতে লজ্জার কি আছে? বেকারত্বের চেয়ে বড় বোঝা কোনো মানুষের থাকতে পারে না। তাই বেকারত্বকে দূর করতে সব মানুষেরই উচিৎ কোনো কাজকে ছোট না মনে করা।’ PIC_04

লিখন জানান, ‘তারা দুই ভাই বোন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই সংসার করছে। অনেক ছোটবেলায় লিখন তার বাবাকে হারান। এরপর থেকে মা মোছাঃ রওশন আরা বেগমের সাথে তার আশ্রয় হয় ফরিদপুর শহরে নানা বাড়িতে। নানা বাড়িতেই মামা-খালাদের আদরে বেড়ে ওঠেন লিখন। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে তার মা রওশন আরা বেগমও পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান। তখন অনেকটা একা হয়ে পড়েন তিনি। পরিবারের যত কিছুই থাক না কেন ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিলো লিখনের। এ কারণে ২০১১ সালে সাউথ কোরিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে গিয়ে পূরণ করেন তার লালিত স্বপ্ন। সাউথ কোরিয়ায় কর্মরত অবস্থায় নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় দু’টি প্লট কিনেন। এছাড়াও কক্্রবাজারে কিনেন একটি ফ্ল্যাট। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে সে দেশে চলে আসেন। দেশে আসার আগেই তার পরিকল্পনা ছিলো সে বড় কিছু করবে না। ছোট কোন কাজের মাধ্যমেই সকলকে দেখিয়ে দিবেন যে কোন কাজই ছোট নয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি তার ‘ড্রিম ভ্যান’-এর উদ্ভোধন করেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর মহম্মদপুরে একটি মেসে থেকে তার ‘ড্রিম ভ্যান’ এর ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

লিখন বলেন, ‘আমরা দেশের বাইরে যখন কাজ করি তখন ছোট কাজ করতে কুন্ঠাবোধ করি না। কিন্তু দেশে এসেই বড় কিছু করার চেষ্টা করি। আর হুট করে বড় কিছু করতে গিয়েই অনেকসময় লোকসানের মধ্যে পড়ি। যার ফলে আবার আমাদেরকে বাইরের দেশে ফিরে গিয়ে সেই কষ্টই করতে হয়। অথচ এই কষ্টটা যদি আমরা নিজের দেশে করি তাহলে দেশও এগিয়ে যাবে, আর আমাদেরকেও লোকসানের মধ্যে পড়তে হবে না।’PIC_02

লিখনের মূল চিন্তা দেশের শিক্ষিত যুবকদের নিয়ে। শিক্ষিত বেকার যুবকদেরকে কর্মদ্যোগী ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষেই কাজ করে চলেছেন তিনি ।

লিখন বলেন, ‘আমাদের দেশের শিক্ষিত যুবকরা ছোট কাজ করতে লজ্জা পান। কিন্ত বাইরের দেশে এমনটা নয়। বাইরের দেশে সম্মানের চেয়ে কাজকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় । সে কারণে বাইরের দেশগুলো উন্নত। আমাদের দেশে হাজারের উপরে ছোট ছোট সেক্টরে কাজ খালি রয়েছে। যেসকল সেক্টরে কাজ করতে আমাদের শিক্ষিত যুবকরা লজ্জাবোধ করেন। ফলে ভালো চাকুরি পাবার আশায় দীর্ঘসময় তাদেরকে বেকার বসে থাকতে হয়। বেকার বসে না থেকে তারা যদি ছোট সেক্টরগুলোতে কাজ করতে থাকেন তবে একসময় ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন এবং দেশও অনেক এগিয়ে যাবে। এছাড়া অনেক যুবক বেকারত্বকে দূর করতে অসৎ পথ বেছে নেন। যেমন- চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি। কিন্তু কেউ যদি ছোট কাজও করেন তাহলে সমাজ থেকে অপরাধ প্রবণতাও হ্রাস পাবে।’

ড্রিম ভ্যান ও পুঁজি সম্পর্কে লিখন জানান, ভ্যান গাড়িটি কিনতে তার খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। তার ভ্যান গাড়িতে মোট ১৫/১৬ হাজার টাকার পণ্য রয়েছে। মোটামুটি ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়েই এ ব্যবসায় নেমেছেন তিনি। ড্রিম ভ্যানের মাধ্যমে প্রতিদিন তিনি যা আয় করেন তাতে তার প্রতিদিনের খরচ ভালোভাবেই চলে যায়।PIC_03

পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বাঁধা আসে না? এমন প্রশ্নের উত্তরে লিখন বলেন, ‘আমার পরিবারের লোকজন সবাই কোটিপতি। কিন্তু তারা আমাকে এ কাজ করতে বাঁধা দেননি। বরং তারা আমাকে উৎসাহ দেন এবং আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। এছাড়া আমার পরিবারের যা আছে এবং আমি নিজে প্রবাসে কাজ করে যে অর্থ-সম্পদ অর্জন করেছি তাতে আমার আর কোনো কাজ না করলেও চলবে। কিন্তু তারপরেও আমি বসে থাকবো না’

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখন বলেন, ‘বড় কোনো কাজ করার ইচ্ছা আমার নেই। নিজের দেশে এরচেয়ে ছোট কাজ করেও আমি শিক্ষিত বেকার যুবক ভাইদেরকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবো।’

আপডেট : বৃহস্পতিবার ফেব্রুয়ারি ১৮,২০১৬/ ১২:৩০ পিএম/ তারেক পলিন

 


এই নিউজটি 2194 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments