” দুর্বল শাসনকার্য” ও বিশ্ব দুর্নীতির লুকানো খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমরাও -এহসান কলিন্স

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ ,২৩ মার্চ, ২০১৬ | আপডেট: ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ ,২৩ মার্চ, ২০১৬
পিকচার

” দুর্বল শাসনকার্য” ও বিশ্ব দুর্নীতির লুকানো খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমরাও

আমার মনে হয় অনেকেই  সিনেমাটা  দেখেছেন হলিউড এর ছবি “ব্লাড ডায়মন্ড”, যাতে মুল অভিনেতা থাকেন লেওনারদো ডিক্যাপ্রিও। লন্ডা, যেখানে প্রচুর ব্যক্তি ল্যান্ড মাইনের শিকার হয়েছিল যারা রাস্তায় থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিল আর যুদ্ধে অনাথ হওয়া শিশুরা রাস্তার নীচে নর্দমায় থাকছিল, এবং সংখ্যায় খুব কম,খুবই ধনী উচ্চবিত্ত কিছু মানুষ যারা সবসময় আলোচনা করতো ব্রাজিল এবং পর্তুগাল এ কেনাকাটি করতে যাওয়ার, ভোগ বিলাসের।

যখন আমরা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি, যখন আমরা আমাদের যক্ষের ধন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ  চুরির কথা বলি, যখন আমরা জনতা ব্যাংকের কোটি টাকা চুরির কথা বলি, তখন কিছু বিশেষ টাইপের ব্যক্তিদের কথা মনে পরে।

১. ভূতপূর্ব সোভিয়েতের সব ক্ষমতা পাগলরা। সাপারমুরাত নিয়াযভ, এদের মধ্যে একজন। ২০০৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, তিনি তুর্কেমিনস্তান এর সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক ছিলেন, যেটা মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ একটা দেশ। তিনি রাষ্ট্রীয় ফতোয়া জারি করতে খুব ভালবাসতেন। তিনি লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করতেন এক উদ্ভট ব্যক্তিত্বকে জনপ্রিয় করার জন্য, এবং তার চরম গৌরব ছিল সেই বিল্ডিং যা কি না ৪০ ফুট উঁচু সোনার পাত দিয়ে মোড়া তার নিজের মূর্তি, যা রাজধানীর মুখ্য চত্বরে সদম্ভে দাঁড়িয়ে সূর্যকে অনুসরণ করে ঘুরতে থাকতো। সে একটু অস্বাভাবিক ধরনের ব্যক্তি ছিল।

২. সেই অতি আলোচিত আফ্রিকান স্বৈরশাসক, মন্ত্রী, সরকারী কর্মকর্তা- টেওডোরিন ওবায়াং। তার বাবা ছিলেন ইকোইটোরিয়াল গিনির আজীবনের জন্য নিযুক্ত প্রেসিডেন্ট, এটা পূর্ব আফ্রিকার একটা দেশ যা ১৯৯০ সাল থেকে লক্ষ্ লক্ষ্ ডলার এর তেল রপ্তানি করেছে যদিও এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস ভয়াবহ। এর অধিকাংশ মানুষই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে যদিও এর মাথা পিছু আয়ের পরিমাণ পর্তুগালের সমান। ওবিয়াং জুনিয়র ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যালিবুতে একটি ৩০ মিলিয়ন ডলার এর বিলাসবহুল বাড়ী কিনলেন। সেটা  ছিল একটা জমকালো বাড়ি। উনি ১৮ মিলিয়ন ইউরোর শিল্প সংগ্রহ কিনেছিলেন ইভস সেন্ট লরেন্ট নামের একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এর থেকে, আর এক গাদা চমৎকার স্পোর্টস গাড়ী, যার একেকটার দাম মিলিয়ন ডলার।  কিন্তু এর  কিছু দিন আগ পর্যন্তও উনি সরকারী বেতনই আয় করতেন যা ৭০০০ ডলার এরও কম।

৩. ড্যান এতেত। উনি নাইজেরিয়ার প্রাক্তন খনিজ তেলের মন্ত্রী ছিলেন প্রেসিডেন্ট আবাচার এর সময়ে এবং দেখা গিয়েছিল যে,উনি টাকার অবৈধ লেনদেনের এর সাথেও জড়িত ছিলেন। পুরো ১ বিলিয়ন ডলারের তেলের লেনদেন তিনি জালিয়াতি করেছিলেন যা ছিল খুবই জঘন্য।

তাহলে এটা ধরে নেওয়া খুবই স্বাভাবিক যে দুর্নীতি ঘটে অন্য জায়গায় কোথাও, কিছু স্বৈরাচারী লোভী মানুষ এবং কিছু অসৎ ব্যক্তি যা ঘটায় অন্য কোন দেশে, কোন জায়গায় যার সম্পর্কে, যেখান সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভাবে আমরা খুব কম জানি আর নিজেদের সেটার থেকে বিযুক্ত মনে করি । এইসব দুর্নীতির সবচেয়ে বড় কারণ হল, আমাদের রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা ! কারণ তারা নিজেদের বাগাড়ম্বরকে গুরুত্ব দিতে অথবা অর্থপূর্ণ ও সুসম্বন্ধ প্রণালীতে এর মোকাবিলা করতে পারে না।

এখন ফিরে যাওয়া যাক সেই মানুষদের কথায় যাদের কথা আমি একটু আগে লিখলাম । যারা নিজেরা একা এই দুর্নীতিগুলো করার ক্ষমতা রাখেন না। যেমন ধরুন ওবিয়াং জুনিয়রের কথা। তিনি অন্যের সাহায্য ছাড়া কখনই বিলাসবহুল বাড়ি এবং নামি-দামি শিল্প সংগ্রহের মালিক হতে পারতেন না। তিনি আন্তর্জাতিক বহু ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। প্যারিস এর একটি ব্যাংকে ওনার পরিচালনাধীন কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ছিল, যার একটার মাধ্যমে শিল্পদ্রব্যের কেনা বেচা চলত, এবং আমেরিকান ব্যাংকগুলো অবৈধভাবে ৭৩ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছিলো , যার কিছু ওই ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িটি কেনার জন্য ব্যয় করা হয়েছিল। এবং সে এই সবকিছুতে তার নিজের নামে করেনি। সে ভুয়ো কোম্পানির নাম ব্যবহার করেছিলো। সুতরাং এই সব কিছু’র মূলেও ব্যাংকগুলো জড়িত ছিলো।

এখন ব্যাংকগুলোকে ধরা যাক , এটা আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে ব্যাংক কালো টাকা গ্রহণ করে, কিন্তু তারা তাদের লাভকে প্রাধান্য দেয় অন্যান্য আরও ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থেকে। যেমন ধরুন, মালায়শিয়ার সারাওয়াক এ। এই অঞ্চলে, বনভূমির মাত্র ৫ শতাংশ বেঁচে আছে। মাত্র ৫ শতাংশ। তো এটা কীভাবে সম্ভব? আসলে এর কারণ হল ক্ষমতাভোগীদের একটা দল আর তাদের পৃষ্ঠপোষকরা যারা লাখ লাখ ডলার আয় করছে ব্যাপক হারে গাছ কাটার কারবারকে সমর্থন করে বহু বছর ধরে।রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পরবর্তী কালে তার অস্বীকার করা সত্ত্বেও, তার নিয়ন্ত্রণাধীন ভূমি এবং বন এর লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন নিজের এবং তার পরিবারের সম্পত্তির বৃদ্ধি ঘটানোর জন্য। এবং পৃথিবীর নামী দামী একটি ব্যাংক টাকা যোগান দিয়েছিল অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কাঠকাটার কোম্পানিকে যারা কিনা সারাওয়াক এবং অন্যত্র অরণ্য বিনাশের জন্য দায়ী ছিল। যদিও এটা করতে গিয়ে ব্যাংক তাদের নিজেদের স্থায়িত্বের নীতি লঙ্ঘন করেছিল, কিন্তু ব্যাংক ১৩০ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছিলো ।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর একটি গবেষণায় ২০০ টি দুর্নীতির ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দেখা যায় যে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে অজ্ঞাতনামা শেল কোম্পানির নাম ব্যাবহার করা হয়েছে, যার সবমিলিয়ে মূল্য প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলার। এখন এর মধ্যে বহু কোম্পানি ছিল আমেরিকা অথবা গ্রেট ব্রিটেন, আর এর বিদেশী অঞ্চল এবং উপনিবেশ গুলোর, এবং এটি শুধু দেশের বাইরের সমস্যা নয়, এটি নিজের দেশের সমস্যাও বটে। এই শেল কোম্পানিগুলোই গোপন চুক্তিগুলোর কেন্দ্রে থাকে যা কিনা সমাজের উচ্চবিত্তদের উপকারে লাগে সাধারণ মানুষদের কোন কাজেই আসে না।

আমার দেশ সোনার বাংলা, যেইখানে এখনোও ভোর হলেই ভিক্ষুকের হাক শোনা যায় , এখনো সেই একই ভাবেই মসজিদে আজানের ডাক শোনা যায়, খুব ভোরে এখনও পাখির শব্দে শিশুর ঘুম ভাঙ্গে, নগর সভ্ভতায় বড় বড় অট্টালিকা গর্জে উঠছে আগের চেয়ে অনেক বেশী, একপাশে কবি’রা বৈশাখীর নিমন্ত্রণ করছে ইলিশ ছাড়া যেন জাতীয় সম্পদের বিলুপ্ত না হয়, ‘শিল্পী’রা এখনও গলা ছেড়ে গান করছে সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য, এখনও সস্তা দামে পোশাক এবং মানুষের লাশ পাওয়া যায় এই দেশটিতেই!
এখনও চৈত্রের ঘাম ঝরা শরীরে কুলি মুজুর টাকার যোগান দিচ্ছে আর সেই যক্ষের ধন মজুত রাখার বাক্সটা  -আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর সেই অর্থ চুরি করছে বিশ্ব দুর্নীতিতে লুকানো খেলোয়াড়রা  সঙ্গে আমরাও, যেভাবে আমরা বিশ্ব ক্রিকেট খেলোয়াড়দের মতো করে খেলতে পারছি।
এই সব কিছুই সব ঠিক নিয়মেই চলছে শুধু  বিশ্ব দুর্নীতির খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমাদের কতিপয় সরকারী বেসরকারী দুর্নীতি খেলোয়াড়রা  নীরবে নিভৃতে খেলে যাচ্ছে।

১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে উপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র তার রচিত ‘মুচিরাম গুড়’ নামক প্রবন্ধে লিখেছিলেন , ‘বাঙ্গালা দেশে মনুষ্যত্ব বেতনের ওজনে নির্ণীত হয়। কে কত বড় বাঁদর তার লেজ মাপিয়া ঠিক করিতে হয়।’ তখনকার কেরানী আর চাপরাশিদের চুরিচামারি করে সামান্য ঘুষ গ্রহণের নমুনা দেখেই তিনি লিখেছেন ‘এমন অধঃপতন আর কোন দেশের হয় নাই।’ শ্রদ্ধেয় বঙ্কিমচন্দ্র সাহেব যদি এখন থাকতেন তাহলে তিনি দেখতেন বিশ্ব দুর্নীতির লুকানো খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমরাও এখন খেলতে পারি ! যার নমুনা  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ  চুরি।

বিশ্ব পরিবর্তন ঘটছে; এটাই কি অগ্রগতি? বিশ্বায়নের এই যুগে,দুর্নীতি একটা পৃথিবী ব্যাপী বড় কারবার এবং যার জন্য প্রয়োজন পৃথিবী ব্যাপী সমাধান।

এহসান কলিন্স  |  লেখক, কথা সাহিত্যিক  | তরু মাধবী, ঢাকা

রেফারেন্স  : কারমিয়ান গুচ, গ্লোবাল উইটনেস



এই নিউজটি 537 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments