প্রিয় স্বামী ইলিয়াস আলীর জন্যই রাজনীতিতে অভিষিক্ত হলেন স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৪:০০ পূর্বাহ্ণ ,১৮ এপ্রিল, ২০১৪ | আপডেট: ৪:০০ পূর্বাহ্ণ ,১৮ এপ্রিল, ২০১৪
পিকচার

রাজবাড়ী নিউজ ডেস্ক : প্রিয় স্বামী ইলিয়াস আলীর জন্যই রাজনীতিতে অভিষিক্ত হলেন স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা। এভাবে রাজনীতিতে জড়াবেন এমনটি তার ধারণায় ছিল না। চাকরি  করছেন, সংসার সামলাচ্ছেন সেটিই ছিল তার কাছে প্রিয় জায়গা। কিন্তু স্বামীর সাজানো রাজনৈতিক ময়দানে তাকেই ধরতে হচ্ছে হাল। আর এ কারণে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশেই রাজনীতির ময়দানে পথচলা শুরু করলেন তিনি। গেলো উপজেলা নির্বাচনে রাজনীতির প্রথম পরীক্ষায় তিনি সফল হয়েছেন। ইলিয়াসের নির্বাচনী আসনে সিদ্ধান্ত  নিয়েই উপজেলা নির্বাচনে জয় ঘরে তুললেন লুনা। আর এই জয়ের মধ্য দিয়ে তার জয়ধ্বনি উড়তে শুরু করেছে সিলেটের রাজনৈতিক আকাশে। শেষমেশ স্বামী ইলিয়াসের রাজনৈতিক মাঠে মঙ্গলবার রাতে অভিষিক্ত হলেন লুনা। এ দিন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সিলেট জেলা বিএনপির সকল অংশের নেতাদের নিয়ে তার গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক করেন। আর বৈঠকে ভেঙে দেয়া হয়েছে ইলিয়াস  আলী গঠিত সিলেট জেলা বিএনপির কমিটি। নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদিও আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে কিছুটা মান-অভিমান রয়েই গেছে। কিন্তু এই কমিটি গঠনের চেয়ে সিলেটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদী লুনার রাজনৈতিক অভিষেক। ইলিয়াস গুমের দুই বছর চলে গেল গতকাল। এখনও মিলেনি খোঁজ। সিলেট বিএনপির এই নেতার গুমের ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে লুনা। একদিকে সন্তান, সংসার। অন্যদিকে চাকরি। এর বাইরে তাকে নেতাকর্মীদের চাপ সামলাতে হয়েছে বেশি। ইলিয়াসের অবর্তমানে তার সব কাজ নিজ কাঁধে তুলে নিলেন লুনা। স্বামীর জন্য নীরবে ফেলেছেন চোখের জল। একই সঙ্গে স্বামীর বিশাল রাজনৈতিক রাজত্ব সামলাতে তাকে বারবার ছুটে আসতে হয়েছে সিলেটে। ইলিয়াসের নিজ গ্রাম বিশ্বনাথের রামধানায় বসে যতটুকু সম্ভব স্বামী ইলিয়াসের জন্য দলীয় কর্মকা- চালিয়েছেন। পাশাপাশি ইলিয়াসের সন্ধানে ছুটে গেছেন দুয়ারে-দুয়ারে। লুনা যতবারই ঢাকা থেকে সিলেটে এসেছেন ততবারই দলীয় কর্মকান্ড নিয়ে বেশি ব্যস্ত থেকেছেন। ইলিয়াসের গুমের পর আন্দোলনে যারা নিহত, আহত ও কারাবরণ করেছেন তাদের পাশে ছুটে গেছেন তিনি। করেছেন আর্থিক সহায়তা। সাহস যুগিয়েছেন তাদের। এখানেই শেষ নয় বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে ইলিয়াসের ছায়া হয়ে শক্ত হাতে হাল ধরেছেন। দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রক্রিয়া চালিয়েছেন সফলতার সঙ্গে। লুনা সিলেট জেলার সব ক’টি থানা ও উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ইলিয়াসের অনুপস্থিতি যতটুকু সম্ভব সামলানোর চেষ্টা করেছেন। এই অবস্থায় এলো উপজেলা নির্বাচন। বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জ যেহেতু ইলিয়াসের নির্বাচনী আসন সে কারণে ওই এলাকায় জেলা বিএনপির নেতারা মাথা ঘামাননি। তারাও ইলিয়াসপত্নী লুনার ওপর ভরসা রাখেন। লুনাও স্বামীর হয়ে এই চ্যালেঞ্জ নেন। ইলিয়াসের জন্মভূমি রামধানা গ্রামে বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জের বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক করেন। তিনি নিজেই বিশ্বনাথে সোহেল আহমদ চৌধুরীকে ও বালাগঞ্জে আবদাল মিয়াকে চেয়ারম্যান পদে সমর্থন দেন। তার সমর্থনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে সিলেটের বিএনপি। ইলিয়াসপত্নীর মর্যাদা রাখতে বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জ বিএনপির সকল স্তরের নেতারা মাঠে নামেন। নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন লুনাও। শেষমেশ দু’টি উপজেলায়ই আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থীদের পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে নেন ইলিয়াসপত্নী লুনার প্রার্থীরা। এ নির্বাচনে ইলিয়াসই ছিলেন বড় ফ্যাক্টর। ইলিয়াস গুমের জবাব হিসেবে বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জের মানুষ বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ী করেছেন। আর নিজের সমর্থিত প্রার্থীদের দিয়ে স্বামীর আসনে জয় ঘরে তুলে সিলেটের রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করেন লুনা। মঙ্গলবার ঢাকায় গুলশান কার্যালয়ে সিলেট জেলা বিএনপির নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ওই বৈঠকে ডাক পড়ে লুনারও। স্বামীর জন্য সেখানেই যান তিনি। ওই দিন বেগম খালেদা জিয়ার সামনেই বক্তব্য রাখেন লুনা। নিজের স্বামীর জন্য দোয়া চান তিনি। একই সঙ্গে সিলেটের বিএনপিকে শক্তিশালী করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুরোধ জানান। লুনা বলেন, ইলিয়াস আলী একজন পরিপূর্ণ  রাজনীতিবিদ। তিনি পরিবারের চেয়ে রাজনীতিকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। নেতাকর্মীদের সুখে দুঃখে দিনের পর দিন পড়ে থাকতেন সিলেটে। ইলিয়াস অনেক চেষ্টা করে সিলেটে বিএনপির ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। এই ঐক্যবদ্ধতা ধরে রাখতে তিনি সকলকে অনুরোধ করেন। পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসনের নির্দেশমতো সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার আহ্বান জানান তিনি। লুনার বক্তব্যের আগে বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা সিলেট বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চেয়ারপারসনকে অবগত করেন। আর এ সময় তারা ইলিয়াসের অবর্তমানে সিলেটের সাংগঠনিক দায়িত্ব লুনার হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানান। ইলিয়াস আলীর একান্ত সহকারী ও জেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মো. ময়নুল হক জানান, বৈঠকে ৩-৪ জন নেতা ছাড়া যারাই ভাষণ দিয়েছেন প্রত্যেকেই ইলিয়াস আলীর স্ত্রীর হাতে রাজনীতির দায়িত্ব তুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। দলের নেতাদের বক্তব্য শোনার পর ওই দিন রাতেই বিএনপি চেয়াপারসনের নির্দেশে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমদ চেয়ারপারসনের নির্দেশক্রমে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। ঘোষিত কমিটিতে ইলিয়াস আলীর পত্নীকে প্রথম সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। আর সিলেট বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য হয়ে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হয়েছেন লুনা। নিজেই তিনি নেতাকর্মীদের জানিয়েছেন, স্বামীর জন্য রাজনীতিতে নামছেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে ইলিয়াস আলীকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব বলে আত্মবিশ্বাসীও তিনি। এজন্য সরকার বিরোধী আন্দোলনের তাগিদ তার।
যুগ্ম মহাসচিব হচ্ছেন ইলিয়াস আলী: বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিলে সরব উপস্থিতি ছিল ইলিয়াস আলীর। সিলেট বিভাগের বিএনপিকে সাজানোর পর ইলিয়াস আলী সবাইকে নিয়ে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের শরিক হন। ওই সময় ইলিয়াস আলীকে যুগ্ম মহাসচিব করার দাবি জানিয়েছিলেন দলের সিনিয়র নেতারা। তবে, সিলেট বিভাগে বিএনপিকে শক্তিশালী করতে তার হাতেই দেয়া হয় বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব। আর সাংগঠনিক সম্পাদক হয়ে বিভাগের রাজনীতিতে চমক দেখান ইলিয়াস। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল ঢাকা থেকে গুম করা হয় তাকে। সাংগঠনিক সম্পাদকের পাশাপাশি ইলিয়াস সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় সিলেট জেলা বিএনপির আগের কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। তবে, কেন্দ্রীয় নেতারা আকার ইঙ্গিতে সিলেটের নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন ইলিয়াস আলীকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব করা হচ্ছে। গতকাল সিলেট বিএনপির কয়েকজন নেতাও জানিয়েছেন, অনানুষ্ঠানিক ভাবে তারা জেনেছেন ইলিয়াস আলী যুগ্ম মহাসচিব হচ্ছেন।
আশা আশাই রয়ে গেল
নিখোঁজ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে সন্ধানের প্রধানমন্ত্রী যে আশ্বাস দিয়েছিলেন সে আশ্বাস আশ্বাসই রয়ে গেল বলে মন্তব্য করেছেন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। গতকাল ইলিয়াস আলী নিখোঁজের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে বিএনপি নেতারা বনানীর বাসায় গেলে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন। লুনা বলেন, ইলিয়াস নিখোঁজ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পরিবার নিয়ে বড় আশা করে গিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী সন্ধানের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। আশা করেছিলাম, স্বামীকে ফিরে পাবো। কিন্তু দুই বছর চলে গেল। এখনও স্বামীর সন্ধান পেলাম না। আশা আশাই রয়ে গেল। তিনি বলেন, আমি আশাবাদী, আমার স্বামী আমার কাছে আবার ফিরে আসবে। এজন্য আমি এখন আল্লাহ ওপর ভরসা করে আছি। দুপুর ২টায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্ব বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল ইলিয়াস আলীর বনানীর বাসায় যান। এসময় তারা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন। বিএনপি নেতাদের মধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস  চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম, সহ-দপ্তর  সম্পাদক আব্দুল লতিফ জনি উপস্থিত ছিলেন। তবে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোন কথা বলেননি তারা।


এই নিউজটি 1529 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments