‘বাবা’ ডাকের স্বাদ জানে না শাহ্ আলম

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৭:২৩ অপরাহ্ণ ,১৯ জুন, ২০১৬ | আপডেট: ১১:২২ পূর্বাহ্ণ ,২৪ জুন, ২০১৬
পিকচার

আশিকুর রহমান॥ ১০ বছর বয়সী শিশু মো. শাহ্ আলম। বয়স ১০ বছর হলেও আজ পর্যন্ত ‘বাবা’ কে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারেনি শাহ্ আলম। এতো ছোট বয়সে সে বাবা ছাড়া হয়েছে, যে বাবার কোন অস্তিত্বই তার মনে নেই। শুধু এতটুকু জানে যে তার বাবা জীবিত আছেন। তবে কোথায় আছেন, কেমন আছেন তা জানে না শাহ্ আলম।

মা দিপালী বেগমও ছেলেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চান ‘বাবা’ নামক শব্দটির কাছ থেকে। ইটের ভাটায় কাজ করে কোনমতে ছেলে শাহ্ আলম ও মেয়ে শারমিন (১৪) কে নিয়ে দিনযাপন করেন দিপালী বেগম। কোনভাবে মেয়ে শারমিনের লেখাপড়াটা চালিয়ে রাখলেও অর্থনৈতিক টানপোড়নের কারণে ছেলে শাহ্ আলমকে পড়ালেখা করাতে পারেননি দিপালী বেগম। তাই বর্তমানে ছেলেকে একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ শিখার জন্য দিয়েছেন। এতো কষ্টের মাঝে দিনযাপন করার পরেও ছেলে-মেয়েকে ‘বাবা’র কাছ থেকে দুরে রেখেছেন তিনি। তবে এর পিছনে রয়েছে একটি তুচ্ছ অভিমান। যার ফলে এতোটা কঠোর হয়েছেন দিপালী বেগম।

রোববার বাবা দিবসে এ প্রতিবেদকের কথা হয় রাজবাড়ী জেলা সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বড় ভবানীপুর গ্রামের দিপালী বেগম ও তার ছেলে শাহ্ আলমের সাথে। কথা বলার সময় মা ও ছেলে দু’জনেই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন।

দিপালী বেগম জানান, ১৫/ ১৬ বছর আগে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামের ছলেমান বিশ্বাসের ছেলে সিরাজুল ইসলাম বিশ্বাসের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তখন দিপালী রাজ মিস্ত্রীর হেলপার হিসেবে ও সিরাজুল খোয়া ভাঙ্গার কাজ করতেন। বিয়ের পর তাদের সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিলো। তবে সিরাজুলের মায়ের সাথে বনিবনা হতো না দিপালীর। তুচ্ছ বিষয় নিয়েও বউ-শ্বাশুরীর মধ্যে ঝগড়া লাগতো। এরমাঝে দিপালী ও সিরাজের ঘরে জন্মগ্রহণ করে তাদের মেয়ে শারমিন আক্তার। এর কয়েক বছর পর জন্মগ্রহণ করে তাদের ছেলে শাহ্ আলম। শাহ্ আলমের বয়স যখন দেড় বছর তখন একদিন সিরাজুলের মায়ের সঙ্গে দিপালীর প্রচন্ড ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে সিরাজুলের মা দিপালীকে ওই বাড়ি থেকে চলে আসতে বলে। কিন্তু এসময় নিশ্চুপ ভূমিকায় ছিলো দিপালীর স্বামী সিরাজুল। তখন স্বামীর নিশ্চুপ ভূমিকা মেনে নিতে পারেননি দিপালী। স্বামী ও শ্বাশুড়ীর উপর অভিমান করে পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে শারমিন ও দেড় বছর বয়সী ছেলে শাহ্ আলমকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন তিনি।

এরপর দিপালী বেগম আশ্রয় নেন রাজবাড়ী জেলা সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বড় ভবানীপুর গ্রামে বোনের বাড়িতে। দীর্ঘ নয় বছর ধরে সেখানেই একটি ইটের ভাটায় কাজ করে দুই সন্তান নিয়ে কোনরকম দিনযাপন করছে সে।

অভিমানী কন্ঠে দিপালী বেগম বলেন, ‘ওর (সিরাজুলের) মা যহন আমারে পুলাপান নিয়্যা বাড়ি ত্যা বাইর কইর‌্যা দিলো তহন তো ও (সিরাজুল) সামনেই খারায় ছিলো। মা’র কতার প্রতিবাদ তো করলো না। দুই পুলাপান নিয়্যা ওর সামনে দিয়্যা রিক্সায় উইঠ্যা চইল্যা আসলাম, বাধা তো দিলো না। এতো বছর হইয়্যা গেলো আমরা বাঁইচ্যা আছি, নাকি মইর‌্যা গিছি খোঁজও তো নিলো না। ওর মতো মানুষের হাতে (সাথে) আমার ও আমার পুলাপানের কুনু সম্পর্ক নাই’।

এতো বছরের মধ্যে আপনি স্বামীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেননি? এ প্রশ্নের উত্তরে দিপালী বলেন, ‘ও আমাগেরে খোঁজ নেয় নাই, আমিও ওর খোঁজ নেই নাই। ওর জিদ আছে, আমার নাই? আমি কোনদিনও ওর খোঁজ নিবো না । তয় হুনছি ও নাকি আর বিয়্যা করে নাই এহনো।’

‘বাবা’ বেঁচে থাকতেও আপনার ছেলে মেয়ে ‘বাবা’ কে ডাকতে পারে না। এতে আপনার খারাপ লাগে না? দিপালী বলেন, ‘শারমিন ওর বাপ রে দেখছে, ডাকছে। কিন্তু শাহ্ আলম ডাকতে পারে নাই। ওর তহন দেড় বছর বয়স ছিলো। বর্তমানে আমিই ওগের বাপ-মা। তাই আমার খারাপ লাগে না।’

দিপালী বেগমের এসব কথার মাধ্যমেই বোঝা যায় স্বামীর উপর তুচ্ছ অভিমানের ফলেই এতো বছর সন্তানদের নিয়ে স্বামীর কাছ থেকে দূরে রয়েছেন তিনি। কিন্তু মায়ের এ তুচ্ছ অভিমানের বিষয় এখনো ভালো করে বোঝে না শাহ্ আলম। আর তাই তো মায়ের পাশে বসেই আবেগ আপ্লুত কন্ঠে ‘বাবা’ ডাকের স্বাদ না জানার কষ্ট প্রকাশ করলো সে।

শাহ্ আলম বলে, ‘আমি মা’র কাছে খালি আব্বার নামই হুনছি। মা কয় আমার আব্বা নাকি বাঁইচ্যা আছে। তয় কুনুদিন আমি দেহি ন্যাই আব্বারে। সবাই যহন তাগের আব্বা রে আব্বা কইয়্যা ডাহে, তহন আমারও আমার আব্বার কতা মনে পড়ে। কুনুদিন আমি আব্বা রে আব্বা কইয়্যা ডাকপার পারি ন্যাই। ম্যালা কষ্ট লাগে আমার।’

‘কোন একদিন শাহ্ আলমের বাবা-মায়ের এই তুচ্ছ অভিমান ভাঙবে। তারা আবার আগের মতো সুখে শান্তিতে সংসার করবে। শাহ্ আলমও তার বাবাকে প্রাণ ভরে বাবা বলে ডাকতে পারবে। ‘বাবা’ দিবসে রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম  পরিবারের পক্ষ থেকে শাহ্ আলম ও তার বাবা-মায়ের জন্য এই শুভকামনা রইলো।’

 


এই নিউজটি 732 বার পড়া হয়েছে
[fbcomments"]