জাতীয় সম্মেলন চাইনা, জাতীয় অধিকার চাই! – এহসান কলিন্স

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১২:০০ পূর্বাহ্ণ ,২৫ অক্টোবর, ২০১৬ | আপডেট: ১২:০০ পূর্বাহ্ণ ,২৫ অক্টোবর, ২০১৬
পিকচার

‘আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই।’ গানের ভাষায় এমনটি বলা হলেও, সব শিশুর জন্ম সাজানো বাগানে হয় না। রাজধানীসহ সারা দেশে এমন লাখ লাখ শিশু রয়েছে পথেই যাদের জন্ম ও বসবাস। পথে পথে বেড়ে ওঠা এমন শিশুদেরকে ‘টোকাই’, ‘পথকলি’, ‘ছিন্নমূল’ বা ‘পথশিশু’ বলা হয়ে থাকে।
আমরা সভ্য সমাজের স্বাধীন দেশের অধিবাসী। পৃথিবীতে কোন মা কখনও অসভ্য সন্তান জন্ম দেয়না। পরিবেশ, সমাজ তথা পরিবার তাকে সভ্য-অসভ্য রুপে গড়ে তোলে। এক কথায় বলতে গেলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাই পথশিশু। পিতা-মাতার বহু বিবাহ, মৃত্যু, সৎ বাবা-মা দ্বারা নির্যাতিত, ভূমিহীন হওয়া, কোনো প্রকার আশ্রয় না পাওয়া, পরিবারের সদস্য সংখ্যা আর্থিক সঙ্গতির অনুপাতে বেশি হওয়া, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, রাগ করে ঘর থেকে পালানো ইত্যাদি কারণে শিশুরা ঘর থেকে বের হয়ে পথে আশ্রয় নেয়।

পথশিশুদের জীবনযাপন অত্যন্ত দুর্বিষহ। শহরের খোলা আকাশের নিচে, ব্রিজের নিচে, মার্কেট, পার্ক, বাস ও রেল স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থান তাদের আশ্রয় কেন্দ্র। বাজার ও নৌ বা বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক তাদের বসবাস। তারা ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ, বাদাম বিক্রি, কুলি, সিগারেট বিক্রি, হোটেলে পানি দেয়া, হোটেল বয়, গাড়ি ধোয়া-মোছা, ফুল বিক্রি, গৃহস্থালি কাজ, মাদক বিক্রি, চুরিসহ নানা কাজের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে, মেয়ে শিশুরা যৌনবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব শিশু বেঁচে থাকার তাগিদে ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবেও কাজ করে থাকে।

নৌ বা বাস টার্মিনালে তারা রাত-দিন কাজ করে সর্বোচ্চ ২০-৩০ টাকা আয় করে। এ টাকা দিয়ে রাস্তার ধারে খাবারের দোকান, ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনে খায়। আয় না হলে না খেয়েই দিন যাপন করে। পথশিশুরা কাজ না থাকলে খেলাধুলা করে। হাতে একটু টাকা জমলে দল বেঁধে সিনেমা দেখতে যায়। গুল, গাঁজা, সিগারেট, বিড়ি খেয়ে নেশা করে। তারা মনে করে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মার খেলে ব্যথা কম লাগে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে পথশিশুরা।

২০০৫ সালে বিবিসির এবং ইউনিসেফ পথশিশুদের জরিপে বলেছে, বাংলাদেশে মোট ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ পথশিশু রয়েছে। এ হারে বাড়তে থাকলে ২০১৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা হওয়ার কথা ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৪। আর ২০২৪ সাল নাগাদ এ সংখ্যা হবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ জন। গবেষণায় এ বিষয়টি পরিষ্কার যে, মোট পথশিশুর একটি বড় অংশই বসবাস করছে রাজধানীতে। যার অধিকাংশ একবেলা খাওয়া হয়, অথবা উপোস। নোংরা পরিবেশ আর অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর ৮৫ ভাগই রোগাক্রান্ত। এদের ৮০ ভাগেরই জন্ম ফুটপাথে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে ৬টি ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে মোট আসন সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৯শ’। অথচ বর্তমানে সেখানে ৩১৯ জন শিশু রয়েছে। প্রতিবন্ধী ও ভবঘুরে পথশিশুদের সেবা-যত্নের কোনো ব্যবস্থা আশ্রয়কেন্দ্রে নেই। অথচ শিশু আইন ১৯৭৪-এর পঞ্চম ভাগে দুস্থ ও অবহেলিত শিশুদের তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় শিশুনীতি ২০১০ (খসড়া) শিশুর অধিকার অংশের ৬.৪.৩নং ধারায়…..’শিশুর পরিত্যক্ত ও আশ্রয়হীন হওয়ার মৌলিক কারণ অনুসন্ধানসহ পরিত্যক্ত ও নিরাশ্রয় শিশুর আশ্রয় ও খাদ্যসহ সুরক্ষার ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ অর্থাৎ কেউ পথশিশু হলে তাকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। অথচ পথশিশু তৈরি হওয়ার মৌলিক কারণ নিয়ে কোনো প্রকল্প বা কার্যক্রম চোখেই পড়ে না।

সম্রাট আলেকজান্ডার হতাশা করে তাঁর সেনাপতি কে বলেছিলেন “সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ” আসুন আমরাও বলি “হায় ঈশ্বর! কি বিচিত্র এই দেশ” যেখানে এখনও একটি শুকনা পারুটির অর্ধেক মানুষের, আর অর্ধেক কুকুরের খাদ্য। যে শহরে এখনো ১৬ লক্ষ মানুষ, পথশিশু ঘুমিয়ে থাকে খোলা আকাশের নীচে, ডাস্টবিনে, ফুটপাতে। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে আর এখনও তাছলিমা বেগম এর মত মায়েরা পেটের জন্য নিজের সন্তান বিক্রি করে। আমি দিব্বি দিয়ে বলতে পারি এই তাছলিমা বেগম এর ফেলে দেয়া পথশিশুটিই একদিন জাতীয় সম্মেলনের জাতীয় নেতাদের হাতিয়ার হয়ে পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকে অভিনেতা কে নেতা বানানোর জন্যে।

বিশ্ব পরিবর্তন ঘটছে; বাংলাদেশ পরিবর্তন ঘটছে, এটাই কি অগ্রগতি? অর্থনীতিতে অগ্রগতি কখনওই এমন নয় যে, কিছু মানুষ না খেয়েই মরবে আর কিছু মানুষ বেশি খেয়েই মারা যাবে।
চাইনা আমরা জাতীয় সম্মেলন, চাই জাতীয় অধিকার, এইসব অবহেলিত পথশিশুদের!

এহসান কলিন্স  |  লেখক, কথা সাহিত্যিক  | তরু মাধবী, ঢাকা

 

রেফারেন্স  : শিশু অধিকার, ক্রাইম ওয়াচ

ছবি : সংগৃহীত


 


এই নিউজটি 705 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments