ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আমাদের সব কালো বিড়াল -জেনিফার হোসেন

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৯:২৯ অপরাহ্ণ ,২৮ অক্টোবর, ২০১৬ | আপডেট: ৯:২৯ অপরাহ্ণ ,২৮ অক্টোবর, ২০১৬
পিকচার

বাসায় ফিরতে আজকে ট্রেন এবং বাস এর জন্য অপেক্ষা ও ভ্রমণ এর সময় অতীতে ফিরে গেলাম। নিজস্ব ভুবন এ একান্তই নিজের জীবন, পারিবারিক পরিমণ্ডল, বন্ধু-বান্ধব, ভালবাসার মানুষ এবং চলার পথে পরিচিত সবাই কে নিয়েই ভাবছিলাম। একটা ব্যাপার নিশ্চিত, মানুষ এর মন-মানসিকতার বহিঃপ্রকাশই তার মুখের ভাষা। আমরা প্রায়ই অনেক কথা বলে তারপর বলি “আমি আসলে সিরিয়াসলি কিছু মিন করিনি”। কিন্তু অপর ব্যক্তি কখনও ভুলতে পারেনা সেই সবকিছু। এজন্যই অনেকে বলেন “খাবার হজম হয়, কিন্তু মানুষের মুখের বাজে কথা অথবা বাজে মন্তব্য হজম হয়না”। আমি এই কথায় দ্বিমত পোষণ করিনা। আমিও অনেক মানুষকে মাফ করে দেই, হয়তো আগের মত মিশি, কিন্তু আমাকে, আমার প্রিয়জনদের, পরিচিতদের নিয়ে যেই বাজে সমালোচনা আর মন্তব্য হয়েছে সেটা কি চাইলেই ভোলা যায়? কটু-মন্তব্যকারীদের স্বভাব যদি ভুলেই যাই, তাহলে ওদের কে বার বার একি কাজ করার জন্য সুযোগ দেওয়া হয়।

পৃথিবীর সব জায়গায়তেই এসব কথার মারপ্যাঁচ চলে। সে পশ্চিম হোক কিংবা পূর্ব হোক।আমার নিজস্ব ক্যারিয়ার এর জন্যে আমি অনেকদিন বাংলাদেশ এর বাইরে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ইন্ডিয়া, মালয়শিয়া থেকেছি এবং দেখেছি অন্যান্য জাতিদের মধ্যেও ভুল জায়গায় ভুল কথার কারনে মানুষের মধ্যে রেশারেশী চলছেই। আমার এক অস্ট্রেলিয়ান বান্ধবী ‘মেরী’-এর বাবা-মা খুব অশান্তিতে ভুগেছেন তাদের ছেলের বউএর আজে-বাজে কথায়। যেমনটা আমার মা কখনওই ভুলবেননা একজনের মন্তব্যl

২০১২ সালে ঢাকাতে তার কাজের প্রথমদিন উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে আমার বাবা-মা সহ আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেদিন আমার এক্স-শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছেন আমার বাবা-মা আমাকে আনতে। আমার মায়ের ডায়বেটিস রোগ আছে, তাই একটু পরপর খেতে হয়, না হলে ব্লাড-সুগার কমে অসুস্থ হয়ে পরেন। সেদিন আমার ভাইয়া’র ছেলে নেহানও (বয়স তিন) ছিল আমাদের সাথে। ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে, গাড়িতে এসি নষ্ট, এই অবস্থায় আমরা সেই দাওয়াতে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র কারো মনরক্ষার্থে। সেখানে আমার মা বললেন “আমাকে জলদি কিছু খেতে দাও, খুব খারাপ লাগছে”। এরপর যেই গুজব তিনি রটান সেটা ছিল এরকম “জেনিফারের শ্বশুরবাড়ি থেকে ওর বাবা-মা কে কিচ্ছু না খাইয়ে বিদায় দিয়েছেন, এজন্যই ওর মা খিদায় জলদি খাবার চাইলেন”। বেশীদিন আগের কথা নয় , জুলাই ২০১৫ এ একদিন দেখলাম আম্মু তার এক বান্ধবীকে কাঁদতে কাঁদতে বললেন এই ঘটনা এবং সাথে এও বললেন “ভাবী, আমি আমার জীবদ্দশায় আর কখনও ওই বাড়িতে হাত ভেজাবোনা”। আমার আম্মু কখনও কাউকে মন খুলে সমাদর করে খাওয়াতে, উপহার দিতে কার্পণ্য করেননি। উনার উদারতার কারনে আমার দাদী (আম্মু’র শাশুড়ী) আম্মুকে দয়ামা বলে ডাকতেন। অস্ট্রেলিয়ায় “Legal Affairs” এ কাজ করে অনেক মজার কিছু বিষয় দেখলাম। ঐদেশে কারও সম্পর্কে কোন বাজে অথবা মিথ্যা মন্তব্য করায় কোর্ট এ মামলা চলে বছরের পর বছর। এন্টি সোশ্যাল বেহেভিয়ার আইন এ মামলা হয়। আমাদের দেশেও যদি এরকম সবাই খুব সচেতন হই তাহলে কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল করে আজে বাজে মন্তব্য করা বন্ধ হত। যারা কথা খুব বেশী বলেন এবং পুরোটা না শুনেই নিজেই কমেন্ট করেন তাদের উদ্দেশে একটা কথা বলতে চাই -নিজেকে যারা খুব স্মার্ট বলে দাবি করেন, তারা দুনিয়ার সব চেয়ে বড় বেকুব। নিজের প্রশংসায় যারা পঞ্চমুখ তারা কতটা হাস্যকর, নিজেই জানেনা। প্রকৃত খানদানী মানুষ কখনই নিজেকে খানদানী বলে দাবি করেনা, অথবা পাশের আমজনতা কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না। আপনার আড়াল এ কিন্তু মানুষ হাসা হাসি করে। এটা বলে, “এত জানিস্তর হয়ে কি লাভ হয়েছে ওনার? হা হা হা”…কথা একটু কম বলে, একটু ভাবুন, আপনি তো খুব তুখোড় মষ্তিস্কের মানুষ, আপনাকে এভাবে একের পর এক ভুল করে যাওয়া কি মানায়? যারা আপনাদের মত উঁচা খানদান এ জন্মাইনি, আপনার মতে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হইনি কিংবা আপনার মত স্মার্ট নই, তারা না হয় না জেনে, না বুঝে বেকুব এর মত কথা বলবে। নিজেকে একটু মাটিতে টেনে-হেঁচড়ে নামান, তারপর ভুলে জান আপনার দাদা কে ছিল এর বাবা কি করতেন। অহংকার মানুষকেধ্বংস করে, প্রিয়জনদের কাছ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন ধরুন কেউ কারও সম্পর্কে বলছেনঃ

১) “ঐ মেয়ের চরিত্র কি খুব ভাল নাকি? দেখেন জুনিয়র ছেলেদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়?” …হতে পারে ঐ মেয়েটার কিছু স্বভাব ভাল না, তার মানে এই না যে তার জীবনের সবকিছু খারাপ। একটা মেয়ের চরিত্র নিয়ে না জেনে কথা বলা খুব খারাপ। কিছু পুরুষ দাবি করেন, তারা নাকি এক জন মেয়ে কে দেখলেই বলে দিতে পারে সে ভাল নাকি খারাপ চরিত্রের। ২)”আরে এই মেয়ে তো খুবই ক্ষেত ছিল, আমাকে দেখে দেখে এখন একটু সাইজে আসছে”। ওকে তো আমিই স্মার্ট বানাইলাম।” ব্যাপার এমন যে আপনার সাথে কোন ডিজাইন শেয়ার করার পর যদি তুমি ও একটা আইডিয়া দাও, তার মানে এইনা যে তুমি পরবর্তীতে মানুষ কে বলে বেড়াবে “আরে, এই ড্রেস এর ডিজাইন তো আমারই করা”।

৩) “ও ইউনিভার্সিটিতে কোনই স্টাডি করেনি, আমিই তার এক্সাম পেপার লিখে দিতাম” …তাই নাকি? আপনি আরেক জনের এক্সাম লিখে দিতেন, তাহলে আপনারটা লিখেন কখন? এতোই তুখোড় মষ্তিস্কের স্টুডেন্ট আপনি? তাহলে নিশ্চয়ই আপনি মেধা তালিকায় রেকর্ড করেছেন। দেখুনতো আপনার সার্টিফিকেট? কিন্তু রেজাল্ট কিন্তু আপনি তেমনটা নন।

৪)”আপনার স্বামী আপনারে ছাইড়া গেল কেন? সে নিশ্চয়ই নেশা করতো না ?” …আমি কখনই বলিনি এই কথা অথবা যিনি মন্তব্য করেছেন তিনি ঐ বাক্তিকে চেনেনই না।

৫) “এই ছেলে তোর ফ্রেন্ড? এই’টা তো সারাদিন অমক এর বাসায় পইড়া থাকে” …ওই ছেলেটার সামনে ঠিক এইভাবেই বলতে পারবেন তো? অথচ ফেইসবুকে ঠিকই দেখা যায় ঐ ছেলের সাথেই সুন্দর সুন্দর ছবি আপলোড করেন। সেই ছেলেটার সাথেই মিশছেন আবার তাকে নিয়ে ই বাঁকা কথা বলছেন?

গল্প বলতে থাকলে এভাবেই চলতে থাকবে দিন মাস বছর…এই বিষয় এখানেই শেষ করছি…”কিছু বোঝার আগে চলুন আগে মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনি, একটু ভাবি তার পরই না হয় উত্তর দেই অথবা কারও ব্যাপার এ মন্তব্য করি”

রম্য লেখক ‘এহসান কলিন্স’ এর সেই উক্তিটি দিয়েই শেষ করি – ‘অনেক সত্য মিথ্যার ভীড়ে আসুন আমরা সবাই ‘সত্য’ হয়ে বাঁচি’

জেনিফার হোসেন।২৭/১০/২০১৬।

কুয়ালালামপুর,মালয়েশিয়া

 


এই নিউজটি 1013 বার পড়া হয়েছে
[fbcomments"]