কোথাও জেগে থাকে একমুঠো জোনাকি পোঁকা … -এহসান কলিন্স

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১১:৪৭ অপরাহ্ণ ,৩০ অক্টোবর, ২০১৬ | আপডেট: ১১:৪৭ অপরাহ্ণ ,৩০ অক্টোবর, ২০১৬
পিকচার

আমরা খুব ইমোশনাল একটা জাতি! কারও চোখে জল দেখলে আমাদের চোখে জল আসে অবঅবেই। কারও বিপদ দেখলে নিজের বিপদ মনে হয়। রাতে আমরা ঘুমোতে পারিনা, স্বপ্নদেখি সেই দুঃস্বহ যন্ত্রণা। পৃথিবীতে এমন আপন আপন ভাবাভাবির দেশ আর অন্য কোনটি আছে কিনা আমার জানা নেই। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এমন আপন আপন ভাবাভাবি নাই বিধায় স্বতন্ত সব চাওয়া পাওয়া গুলোর জন্যে গার্ডিয়ান হয়ে এগিয়ে আসে সেই দেশের সরকার। চাওয়া পাওয়া শোনা মাত্রই তাদের সরকার ছুটে যায়, আর তাই হয়তো এমন আমাদের মতো আপন আপন ভাবাভাবির আর দরকার হয়ে উঠে না।
শ্রদ্ধেয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর মৃত্যুকে নিয়ে ছোট্ট একটি লেখা ছিলো আমার। মাঝে মাঝেই কেন যেন তাকে খুব স্মরণ করি, বই ঘরে গিয়ে তাঁর লেখা বইগুলো স্পর্শ করি। তাঁকে নিয়ে তাঁর মৃত্যু কে নিয়ে হঠাৎ লিখতে ইচ্ছা হলো -

নিভে যায় সব আলো
থেমে যায় সব মুখরতা,
ঢেকে দেয় পারাপার
শুধু অমানিশা ।
তখনও কোথাও জেগে থাকে
একমুঠো জোনাকিপোঁকা …

মৃত্যু(ইংরেজি ভাষায়: Death) বলতে জীবনের সমাপ্তি বুঝায়। জীববিজ্ঞানে মৃত্যুর সংজ্ঞা পড়েছিলাম, প্রাণ আছে এমন কোন জৈব পদার্থের (বা জীবের) জীবনের সমাপ্তিকে মৃত্যু বলে। অন্য কথায়, মৃত্যু হচ্ছে এমন একটি অবস্থা(state,condition) যখন সকল শারিরীক কর্মকাণ্ড যেমন শ্বসন, খাদ্য গ্রহণ, পরিচলন, ইত্যাদি থেমে যায়। কোন জীবের মৃত্যু হলে তাকে মৃত বলা হয়।
ভাষাদার্শনিক দেরিদা এর একটি লেখা পড়েছিলাম, প্রতিটি প্রতিশ্রুতির ভেতর জড়িয়ে থাকে অন্তর্গত বিচলন (ইংরেজি অনুবাদে আছে ইন্টারনাল আপসেট)। যার কারণ প্রতিটি প্রতিশ্রুতিতে থাকে অবিশ্বস্ততা। জীবনটা একটা প্রতিশ্রুতিই তো। সেই প্রতিশ্রুতিতেই বেশী থাকে অবিশ্বস্ততা। অতএব মৃত্যু জীবনের অনিবার্য শর্ত। জীবনের প্রতিটি কার্যকর উচ্চারণে (পারফরমেটিভ আটারেন্স) ছায়া ফেলে আছে মৃত্যু।

যারা প্রতিভাবান, যারা শিল্পের সঠিক বিকাশ ঘটায় তাদের বেশীরভাগ মৃত্যুই স্বাভাবিক নয়। খাঁন মোহাম্মদ ফারাবী ২০ বছরেই ‘ আকাশের ওপারে আকাশ’ লিখে কালজয়ী হয়েছিলেন। তারপরই মৃত্যু। এটাই আমার এই ভাবনার একটি চুড়ান্ত খতিয়ান। স্রেফ মৃত্যুই বটে। হতে পারে তা অপঘাত,আত্মহনন কিংবা অকালমৃত্যু ।সবটুকু ই স্রেফ মৃত্যু।
জঙ্গলমহলে হঠাত্‍‍ গুলি বা মাইন বিস্ফোরণ. গুরুতর জখম নিরাপত্তাকর্মী. ভয়ংকর ট্রাফিক ভেঙ্গে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অথবা চিকিৎসকের অবহেলা এবং তার পর মৃত্যু। এইসব মৃত্যুর বাইরেও আর একটি মৃত্যু হয়েছিল লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর। সেটা একটি স্রেফ মৃত্যু।
নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এখন অস্তপারের দেশে। যেখান থেকে তাঁর কন্ঠস্বর আর কেউ কোন দিন শুনতে পাবে না কেউ শুধু ঈশ্বর ছাড়া। যে মানুষটির লেখা শেষ না করে আমার কখনও ঘুম হতো না সেই মানুষটির ই স্রেফ মৃত্যু হয়েছিলো।

পবিত্র কোরআন এ ২৭০ নং আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ্‌ আত্তাকে বলেন, “বেরোও।” সে বলে, “না আমি স্বেচ্ছায় বেরোব না।” আল্লাহ বলেন, “অনিচ্ছায় হলেও, বেরোও।”

সারা রাতের সোনালী জোৎস্না শেষে হয়তো হুমায়ূন আহমেদ সেইদিন অনিচ্ছায় হলেও বের হয়েছিল একটি স্রেফ মৃত্যুর জন্যে। হুমায়ূন স্যার হয়তো অগণিত রাতে জোৎস্নার প্লাবনে স্বপ্ন দেখছিল একটি নতুন দিনের, প্রত্যয়ের। হয়তোবা নুহাশ পল্লীর পুকুর পাড়ে স্যারের হাতে ছিল একমুঠো জোনাকি পোঁকা ! আর আজ রাতে আমি লিখছি তাঁর মৃত্যুর সংজ্ঞা। হয়তোবা কালরাতে কেউ না কেউ লিখবে আমার, আমাদের জন্যে একটি দীর্ঘ রচনাবলী-সবটুকু ই স্রেফ মৃত্যুর।

জবাবদিহিতা নামক একটি অনিবার্য শব্দ পৃথিবীর সকল দেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও আমাদের ক্ষেত্রে এটা উল্টা।জবাবদিহিতা থাকলেই কেবল সেবা প্রদান নিশ্চিত করা যায়।যেহেতু সেটা নেই তাই আমাদের গার্ডিয়ানরা, রাজা রাণী’রা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। আর যারা খ্যাতিমান, অগণিত শব্দের স্রষ্টা, ভূখণ্ডের দাবিদার তারা পরে থাকেন সোনালী জোৎস্নার বনে !
একজন মেয়রের নামে যদি একটি ব্রীজ হতে পারে, একজন রাজনীতিবিদের নামে যদি একটি রাস্তা হতে পারে তাহলে আমার দেশের এত্ত বড় একজন লেখকের নামে কিছুই থাকবে না এটা কি হয়?
প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর নামকরন এ কিছু হোক- এই হোক আমাদের প্রত্যাশা—

এহসান কলিন্স| লেখক, কথা সাহিত্যিক| তরু মাধবী, ঢাকা


এই নিউজটি 331 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments