,

খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে ‘৭১’-এ স্বামী হারানো সরজানীর!

News

ফকীর আশিকুর রহমান, নিউজরুম এডিটর॥ ৯৭১ সালে গণহত্যায় হারান স্বামীকে। এরপর সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় একমাত্র ছেলেটির। অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করে একমাত্র মেয়েটিকে কোনভাবে বিয়ে দিতে পারলেও, তার ভাগ্যেও জোটেনি স্বামীর সংসার। এভাবে প্রতিটি পদক্ষেপেই জীবনের সাথে লড়াই করতে হয়েছে সরজানী মন্ডলকে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে এখনো প্রতিনিয়ত লড়ে যাচ্ছেন তিনি। স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাননি শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি, মেলেনি সরকারী কোন সাহায্য-সহযোগিতা। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে কাটছে তার দিন। ভাগ্যটাই যেন বেইমানী করেছে ৭৫বছর বয়সী এই বৃদ্ধার সঙ্গে।

সরজানী মন্ডলের বাড়ি রাজবাড়ী জেলা সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের মুচিদাহ গ্রামে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তার স্বামী যতীন্দ্রনাথ মন্ডলকে হত্যা করে রাজাকার ও অবাঙালীরা।

সরেজমিনে সরজানী মন্ডলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় পাটকাঠি দিয়ে তৈরি একটি ছোট্ট ভাঙা ছাপড়া ঘরে শুয়ে আছেন তিনি। স্বামী পরিত্যাক্তা মেয়ে শান্তা মন্ডলের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল এ বৃদ্ধা প্রথমে ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’-এর সঙ্গে কথা বলতে রাজী হননি। বোঝাগেল, সমাজের মানুষের উপর তার অভিমান যেন তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরবর্তীতে তিনিই প্রকাশ করলেন তার চাপা কষ্ট ও অভিমানের কথা।

স্মৃতি হাতরিয়ে ভেজা চোখ মুছতে মুছতে সরজানী মন্ডল ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ কে জানান, তখন স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছিলো পুরোদমে। একদিন সকাল ৮টার দিকে (দিন ও তারিখ তার মনে নেই) তিনি ও তার স্বামী বাড়িতে বসেছিলেন। হঠাৎ একদল রাজাকার ও অবাঙালী এসে তার স্বামীকে বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর তিনি খবর পান তার স্বামীসহ আরো কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তখন থেকেই শুরু হয় সরজানী মন্ডলের জীবন যুদ্ধ। ছোট্ট দু’টি ছেলে মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনযাপন করতে থাকেন তিনি। এরপর দেশ স্বাধীন হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের তালিকা হয়। কিন্তু তার ভাগ্যে জোটে না কিছুই। স্বাধীনতার ৪৫বছরে অনেকেরই ভাগ্য পরিবর্তন হলেও সরজানী মন্ডলের ভাগ্য দিন দিন খারাপের দিকে ধাবিত হয়েছে।

কান্নাজড়িত কন্ঠে সরজানী মন্ডল ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ কে জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার ১৫ বছর পর একমাত্র মেয়ে শান্তা মন্ডলকে ভারতে বিয়ে দিয়ে একমাত্র ছেলে কাঁলাচান মন্ডলকে নিয়ে স্বামীর ভিটায় বসবাস করতে থাকেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ একদিন রাতে তার জীবনে নেমে আসে আরেক দুঃসময়। সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় একমাত্র ছেলেটির। অপরদিকে, মেয়ে শান্তা মন্ডলও ভারতে স্বামীর সংসারে দুঃখ, কষ্ট ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করতে থাকে। এক পর্যায়ে শান্তা মন্ডল স্বামীর বাড়িতে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রায় ১৪ বছর আগে দুই শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সরজানী মন্ডলের বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে মেয়ে শান্তা মন্ডলের উপার্জনেই কোনরকমে চলছে সরজানী মন্ডলের জীবন-জীবিকা।

স্বাধীনতার এই ৪৫বছরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সরকারী কর্মকর্তারা আপনার কোন খোঁজ নেন নি ?? এমন প্রশ্নের জবাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে সরজানী মন্ডল জানান, ‘শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকবার তার নাম লিস্ট করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি স্বীকৃতি পান নি। এই ৪৫বছরে তিনি সরকারী সহযোগিতা পাবার আশায় বহুবার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কাছে ধর্না দিয়েছেন। কিন্তু কেউ তাকে কোন সহযোগিতা করেন নি। তাই এখন তার বাড়িতে কেউ আসলে তিনি অভিমানে কারও সাথে কথা বলতে চান না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সু-দৃষ্টি কামনা করে সরজানী মন্ডল ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ কে বলেন, ‘আমার সুয়ামি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জীবন দিছেন। এতোডা বচ্ছর আমি বুকে চাপা কষ্ট নিয়্যা বাঁইচ্যা রইছি। জীবনের শ্যাষ মুহুর্তে আইস্যা এহন যদি ‘শহীদ পরিবারের’ স্বীকৃতিটুক পাই তাইলি মইর‌্যাও শান্তি পাবো।’

সরজানী মন্ডলের মেয়ে শান্তা মন্ডল ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ কে জানান, মানুষের বাড়িতে ও ফসলী জমিতে কাজ করে তিনি যা আয় করেন তা দিয়েই বৃদ্ধা মা ও দুই সন্তানকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনযাপন করছেন। সমাজের মানুষেরা যেন তাদের কষ্ট দেখেও না দেখার ভান করেন। তবে, শত কষ্টের মাঝেও তিনি তার সন্তানদের পড়ালেখা বাদ দেওয়ান নি। ছেলে রতন মন্ডল স্থানীয় রাজাপুর ইয়াছিন ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণীর ছাত্র। আর মেয়ে প্রিতী রাণী মন্ডল পড়ছেন কেলা সদর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। শান্তা মন্ডলের স্বপ্ন তার ছেলে-মেয়ে অনেক বড় হবে। ভালো চাকরি করবে। শান্তা মন্ডলও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাকে শহীদের সন্তান ও তার মাকে শহীদের স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান।

এ বিষয়ে বসন্তপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ আবু বক্কার ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ কে বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাজাকার ও অবাঙালীরা সরজানী মন্ডলের স্বামী যতীন্দ্রনাথ মন্ডলকে হত্যা করে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি অতিকষ্টে দিনযাপন করছেন। যুদ্ধের সময় এ এলাকায় আরও কয়েকজনের স্বামীকে হত্যা করা হয়েছিলো। কিন্তু সরজানী মন্ডলের মতো অভাগী আর একজনও নেই। ইতিপূর্বে কয়েকবার তার বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছিলো। কিন্তু কখনো তার কোন গতি হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে যদি সরজানী মন্ডলকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয় তাহলে শেষ বয়সে সে একটু শান্তিতে দিনযাপন করতে পারবে।’

বসন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মীর্জা বদিউজ্জামান বাবু ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’ কে বলেন, ‘আমি বিগত ইউপি নির্বাচনে এই প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। সরজানী মন্ডলের বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। তবে আমি খোঁজ নিয়ে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।’

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর