মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান ইন্সপেক্টর প্রণব

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ১:৩৮ অপরাহ্ণ ,২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ | আপডেট: ১:৩৮ অপরাহ্ণ ,২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬
পিকচার

বিশেষ প্রতিবেদক॥ মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ওপর প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ পুলিশ। অথচ সেই বাংলাদেশ পুলিশের গর্বিত অবসরপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর প্রণব বন্ধু চৌধুরী সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েও স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার সনদ পাননি। মেলেনি মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি। আর তাই জীবনের পড়ন্ত বেলাতেও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানের স্বীকৃতি চান এ বীর সেনা।

প্রণব বন্ধু চৌধুরী বলেন, আমার বাড়ি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি গ্রামে। আমার বাবার নাম কুমুদ বন্ধু চৌধুরী। আমি বর্তমানে রাজবাড়ী শহরের পুলিশ লাইন এলাকায় থাকি।

তার ভাষায়, ‘আমি ১৯৭০ সালে তৎকালীন (ইপিপি) ইস্ট পাকিস্তান পুলিশে চাকরিতে যোগ দেই। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর পাক হানাদার বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ইপিআর হেড কোয়াটার (বিডিআর পিলখানা) একযোগে ট্যাংক, মেশিনগান, কামান ইত্যাদি নিয়ে আক্রমণ করে। আমি তখন ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে ছিলাম। এই রাতেই আমরা ময়মনসিংহ তৎকালীন ইপিআর (বিডিআর) ক্যাম্পে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই।

তিনি বলেন, ‘তখন ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনের ম্যাগাজিন গার্ডে (বিপদ সংকেত) জরুরি অ্যালার্ম বেজে উঠে। আমরা পুলিশ বাহিনীর সমস্ত সদস্য দ্রুত সরকারি পোশাক পরে অস্ত্রাগার হতে অস্ত্র, গুলি নিয়ে ইপিআর ক্যাম্পের দিকে গুলি করতে করতে অগ্রসর হই। আমাদের দায়িত্বে ছিলেন হাবিলদার আব্দুল আজিজ। তিনি আমাদেরকে তিনটি প্লাটুনে ভাগ করে তিন দিক থেকে আক্রমণের নির্দেশ দেন।

এ সময় হাবিলদার মেজর আব্দুল জব্বার যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। ইপিআর ক্যাম্পের গোলাগুলির ঘটনায় পাকিস্তানি ইপিআর সদস্যরা বাঙ্গালি ইপিআরদের ওপর অতর্কিত ব্রাশফায়ার শুরু করে এবং বেশ কিছু বাঙ্গালি ইপিআর সদস্যকে মেরে ফেলে। তখন আমরা ইপিআর ক্যাম্পের তিন দিক থেকে আক্রমণ করে জীবিত ইপিআরদের রক্ষা করি এবং পাকিস্তানি ইপিআরের ১২জন সদস্যকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করি। এদের সঙ্গে একজন সুবেদার মেজরও ছিলেন। আত্মসমর্পণকারীদের পুলিশ লাইনে নিয়ে আসা হয়। পরে পুলিশ লাইনের উত্তর দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে গুলি করে তাদের মেরে ফেলি। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে ইপিআর, বিহারী, পাঞ্জাবিসহ ৪৫/৫০জন মারা যায়। বাকিরা রাতের অন্ধকারে পালিয়ে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর গড় অভিমুখে রওনা দেয়।

তিনি আরো বলেন, ‘১৩ এপ্রিল আমরা জানতে পারি পাকবাহিনী টাঙ্গাইল থেকে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তখন আমরা ময়মনসিংহ পুলিশ লাইন হতে হাবিলদার আব্দুল আজিজসহ ১৪০জন ট্রাকযোগে মধুপুর গড়ের দিকে রওনা হই। বেলা আনুমানিক ২টার দিকে পাকবাহিনীর একটি জীপ ও দুটি ট্রাক পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে আসতে দেখি। আমরা তৎক্ষণাৎ গাড়িগুলোর ওপর হামলা চালাই। আমাদের আক্রমণে পাকবাহিনীর পাঁচজন সেনা মারা যায় এবং হানাদার বাহিনীর বাকি সদস্যরা টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতির দিকে চলে যায়। আমরা পাকবাহিনীর তিনটি গাড়ি ও বেশ কিছু রাইফেল ও গুলি জব্দ করি।

ওই দিন শেরপুরের নালিতাবাড়ী বর্ডার হয়ে ভারত থেকে একজন বিএসএফ ক্যাপ্টেন এদেশে আসেন। তার নাম বালজিৎ সিং। তার সাথে ইপিআরের একজন সুবেদার ছিলেন। তারা মধুপুর আসেন এবং আমাদের সহযোগিতায় মধুপুর বাজারের ব্রিজ ভাঙেন। রাতে আমরা মধুপুরে অবস্থান করি।

তিনি বলেন, ‘পরদিন ১৪ এপ্রিল সকালে আমরা লোক মারফত জানতে পারি পাকবাহিনী কালিহাতি থেকে টাঙ্গাইল জেলার দিকে অগ্রসর হয়েছে। এই সংবাদ পাওয়ার পর আমরা অস্ত্র, গুলি নিয়ে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে পায়ে হেঁটে রওনা হই। কালিহাতি পৌঁছালে ওই এলাকার লোকজন জানান, আর সামনে অগ্রসর হওয়া যাবে না। আমরা তখন কালিহাতি বাজার ও ব্রিজের ডান এবং বাম পাশে বাংকার তৈরি করতে থাকি। তখন গ্রামবাসী আমাদেরকে রুটি, কলা, ডিম, মুড়ি ও চিড়া খাওয়ায়।

পরের দিন ১৫ এপ্রিল কালিহাতি ব্রিজের দুই পাশে ইপিআরদের মাধ্যমে দুটি রকেট রেঞ্জার ও মেশিনগান সেট করি। আমরা ব্রিজ থেকে অনুমান দু’শত গজ সামনের দিকে ডিফেন্সে থাকি। বেলা ১১টার দিকে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে পাকবাহিনীর দুটি বিমান উড়ে যায়। এরপর হঠাৎ একটি পাক বাহিনীর জীপ পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে ধীরগতিতে কালিহাতি ব্রিজের দিকে আসতে থাকে। তার পিছনে আনুমানিক ২০/২৫টি গাড়ি ভর্তি পাক হানাদার বাহিনী ছিল। সবার হাতেই বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। সাথে সাথে আমাদের রেঞ্জার রকেট থেকে গুলি ছোঁড়া হয়। আমাদের আক্রমণের কারণে রকেটের গোলার আঘাতে একটি জীপ ও একটি ট্রাক উল্টে রাস্তার নিচে পড়ে যায়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। বেশকিছু সময় গোলাগুলি চলতে থাকে। তখন পাকবাহিনী আমাদেরকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। আমাদেরও গুলি শেষ হয়ে যায়। আমাদের পুলিশসহ বেশ কিছু ইপিআর সদস্য আহত ও নিহত হন। আমরা প্রাণ রক্ষার্থে যে যে দিকে সম্ভব সরে পড়ি।

তিনি বলেন, পাকবাহিনীর গোলাগুলির মধ্যে দৌড়িয়ে কালিহাতি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার গিয়ে আমি কুষ্টিয়া নামক গ্রামের এক বাড়িতে আশ্রয় নিই। পরদিন সকাল ৬টার দিকে আমি ময়মনসিংহ জেলার উদ্দেশে রওনা হই। পথিমধ্যে হাবিলদার আব্দুল আজিজসহ সঙ্গীয় পুলিশ সদস্য চিত্তরঞ্জন সরকার, পরেশ কান্তি সাহা, আবুল কালাম, রঞ্জন আরো কয়েকজন একসাথে ময়মনসিংহ জেলার উদ্দেশে পাহাড়ি পথ দিয়ে পুলিশ লাইনে পৌঁছাই। পুলিশ লাইনে পৌঁছানোর পর তা জনশূন্য দেখতে পাই।

তার ভাষায়, ‘এ সময় ময়মনসিংহ শহরের পাশে শম্ভগঞ্জে বিকট আওয়াজে বোমাবর্ষণ চলতে থাকে। তখন আমি, চিত্তরঞ্জন সরকার, দীপক কুমার বিশ্বাস, দিলীপ কুমার ঘোষ, শরিফুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, পবিত্র কুমারসহ আরো কয়েকজন এক সাথে জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালার ব্রহ্মপুত্র নদের ঘাট নৌকাযোগে পাড় হয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামের ভিতর দিয়ে হালুয়াঘাট থানার উদ্দেশে রওয়ানা হই। হালুয়াঘাট থানায় কয়েকদিন অবস্থান করে হালুয়াঘাট বাগমারা বর্ডার দিয়ে ভারতে যাই।

তিনি আরো বলেন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর আমি দেশে ফিরে আসি ও ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি পুনরায় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ লাইনে চাকরিতে যোগ দেই। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১০ জুন গাজীপুর জেলা হতে ইন্সপেক্টর পদে অবসর গ্রহণ করি।

তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতার যুদ্ধে দেশের জন্য জীবনবাজি রেখে শত্রুদের মোকাবেলা করেছি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইনি। অথচ বাংলাদেশ পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স থেকে প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা’ শীর্ষক বইতেও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুলিশ সদস্যদের অনুপস্থিতিদের নামের তালিকায় আমার নাম রয়েছে। এমনকি রাজবাড়ী জেলা পুলিশের উদ্যোগে ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা’ শীর্ষক বইতেও দুজন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে আমার অবদানের কথা স্মৃতিচারণ করেছেন।

তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় গ্রেজেডভুক্ত হওয়ার জন্য ১৯৯০ সালে প্রথম তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ২০১৪ সালে তিনি আবারো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে গ্রেজেডভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেন। সেই আবেদনটি জামুকাতে দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু এরপরও তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর শুদৃষ্টি কামনা করেন।

এ ব্যাপারে তার সহযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত (আরআই) মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ বলেন, প্রণব বন্ধু চৌধুরী তার সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে এবং বড় বড় অপারেশন করেছেন। সে মুক্তিযোদ্ধা সনদ পায়নি। এটা খুবই দুঃখজনক।

১১নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার কেএম শামসুল আলম বলেন, প্রণব বন্ধু চৌধুরী ২৫শ মার্চ হতে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের সাথে মধুপুর গড়ে ও কালিহাতিতে সম্মুখ যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দেন।

আরেক সহযোদ্ধা বীরমুক্তিযোদ্ধা চিত্তরঞ্জন সরকার বলেন, মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ সদস্য প্রণব বন্ধু চৌধুরী তার সাথে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছেন। তার সেই বীরত্বের কথা তিনি রাজবাড়ী থেকে প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা’ শীর্ষক বইতেও স্মৃতিচারণ করেছেন।

রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম/ শিহাব/ আশিক


এই নিউজটি 661 বার পড়া হয়েছে
[fbcomments"]