ঝালমুড়ি বিক্রি করে ৫০ বছর!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৩:২১ অপরাহ্ণ ,১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ | আপডেট: ৩:৩০ অপরাহ্ণ ,১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭
পিকচার

ফকীর আশিকুর রহমান, নিউজরুম এডিটর তোরাপ আলী মোল্লা। বয়স ৬৭ বছর। বার্ধক্যের ছাপ তার শরীরকে খুব বেশি গ্রাস করতে পারেনি। দূর থেকে দেখে মনে হবে তিনি ৩০ বছর বয়সী কোন জোয়ান। কাছ থেকে দেখেও বোঝার উপায় যে তিনি একজন ৬৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ।

এই ৬৭ বছরের জীবনে তোরাপ আলী দীর্ঘ ৫০ বছর কাটিয়েছেন ঝালমুড়ি বিক্রি করে। ঝালমুড়ি বিক্রি করেই সাত সন্তানকে বড় করেছেন, কম-বেশি লেখাপড়া শিখিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন। একজনকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। জীবনের প্রায় পড়ন্ত বেলায় এসে এখনও তিনি ঝালমুড়ি বিক্রি করে চলেছেন। ‘এখন যে শুধু জীবিকার তাগিদে এ কাজ করছেন তা নয়, পেশা থেকে এটি এখন তার নেশায় পরিণত হয়েছে’- এমনটিই জানালেন তোরাপ আলী।

তোরাপ আলী মোল্লার বাড়ি রাজবাড়ী জেলা সদরের খানখানাপুর ইউনিয়নের মিয়াপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত আ. সামাদ মোল্লা। শনিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৫টায় জেলা সদরের বসন্তপুর বাজারে ভ্যানগাড়িতে করে ঝালমুড়ি বিক্রি করার সময় তোরাপ আলীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

তোরাপ আলী জানান, ১৭ বছর বয়সে ১৯৬৭ সাল থেকে ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেন তিনি। তখন রাজবাড়ী জেলা সদরের খানখানাপুরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সুরাজ মোহিনী ইনস্টিটিউটে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। সেখানে ১১বছর ব্যবসা করার পর তিনি চলে আসেন জেলা সদরের বসন্তপুর কো-অপারেটিভ হাই স্কুলে। দীর্ঘ ৩৯বছর ধরে তিনি সেখানেই ঝালমুড়ি বিক্রি করে চলেছেন। স্কুল ছুটি হবার পর বসন্তপুর বাজারে কিছুক্ষণ বিক্রি করেন। এরপর বাড়ি ফিরে যান। এছাড়া কোথাও বিশেষ কোন অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ ও ওয়াজ মাহফিলের কথা শুনলে ঝালমুড়ির ভ্যানগাড়ি নিয়ে চলে যান সেখানে।

তিনি আরও জানান, এই ঝালমুড়ি বিক্রি করাকালেই তিনি বিয়ে করেছেন। এরপর তার ঘরে জন্ম নিয়েছে পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে। এই কাজ করেই তিনি সাত সন্তনকে বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। সন্তানদের মধ্যে পাঁচ জনকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত, একজনকে এসএসসি পাশ ও একজনকে বিএ পাশ করিয়েছেন এই ঝালমুড়ি বিক্রি করেই। সন্তানরা সবাই যার যার মতো সুখে সংসার করছেন। বিএ পাশ বড় ছেলে স্থানীয় একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে চাকরি করছেন। ছোট ছেলেও একটি তেলের পাম্পে কাজ করেন।

এখন তো আপনার সন্তানরা বড় হয়েছে, তারা রোজগার করছে। এই বয়সে আপনাকে তারা ঝালমুড়ি বিক্রি করতে নিষেধ করেন না ?? এমন প্রশ্ন রাখতেই তোরাপ আলী বলেন, ‘তারা তো সব সুমায়ই না করে। কিন্তু ভাঁজা (ঝালমুড়ি) না বেঁচলি আমি ঘরে পইড়্যা যাবো (অসুস্থ্য হয়ে যাবো)। এই ড্যা এহন খালি আমার পিশা না, নিশাও হইয়্যা গিছে। ভাঁজা বেচি, মানসির মদ্দি চলি, আনন্দে থাহি সব সুমায়। টাহাও কামাই করি প্রত্যেকদিন ৩/৪শ’ কইর‌্যা’।

এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে আপনি একটানা ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন। চাইলে তো অন্য পেশায়ও চলে যেতে পারতেন। কিন্তু এই পেশাতেই টিকে থাকার রহস্য কি? তোরাপ আলী বলেন, ‘আমি যহন এই কাম শুরু করি, তহন থেইক্যাই আমার ইচ্ছ্যা ছিলো এই কাম ছাড়বো না। ছোট ওক (হোক), বড় ওক, নেক নিয়ত নিয়্যা যে কুনু এক কাম ধইর‌্যা থাকলি আল্লাহ বরকত দেয়। ম্যালা মানুষ আছে যারা আইজ এই কাম, কাইল ওই কাম করে। তারা শেষ পর্যন্ত কিছুই করবার পারে না।’

জীবনের বাকীটা সময় তোরাপ আলী ঝালমুড়ি বিক্রি করেই কাটাতে চান। তার মতে- ‘সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করলে, যে কোনও পেশায় কাজ করেই সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করা যেতে পারে।’

তোরাপ আলীর বিষয়ে জানতে চাইলে বসন্তপুর কো-অপারেটিভ হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. এমের আলী শেখ বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় এই স্কুলে পড়ালেখা করেছি। এখন এখানে শিক্ষকতা করি। সেই ছোটবেলা থেকে তোরাপ ভাইকে এই স্কুলে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে দেখে আসছি। তিনি অনেক সৎ এবং ভালো মনের একজন মানুষ। তার ঝালমুড়িও অনেক মজা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো- ওনার শারীরিক গঠন আমি ছোটবেলায় যেমন দেখেছি, এখনও তেমনই দেখছি।’


এই নিউজটি 1516 বার পড়া হয়েছে
[fbcomments"]