প্রেম করে বিয়ে, অতঃপর ‘অপহরণ’ মামলায় জেলে

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৩:৫৮ অপরাহ্ণ ,৭ জুন, ২০১৭ | আপডেট: ১১:৫৯ অপরাহ্ণ ,৭ জুন, ২০১৭
পিকচার

ফকীর আশিকুর রহমান, নিউজরুম এডিটর॥ ২১ বছর বয়সী তরুণ রায়হান হীরাকে ভালোবেসেছিলো ১৮ বছর বয়সী তরুণী তমা (ছদ্মনাম)। এক বছরের প্রেমের সম্পর্ককে শুভ পরিনয় দিতে হীরার হাত ধরে পালিয়ে বিয়েও করেছিলো সে। কিন্তু এ ভালোবাসা ও বিয়েকে মেনে নিতে পারেননি তমার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা। অভিযোগ উঠেছে, মিথ্যা অপহরণ মামলায় ফাঁসিয়ে হীরাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন তিনি।

এদিকে, অর্থাভাবে হীরাকে মামলা থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াই করতে পারছেন না তার দরিদ্র পরিবার। ছোটভাইকে মামলা থেকে মুক্ত করতে সহযোগিতা চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হীরা ও তমার (ছদ্মনাম) ছবি পোস্ট করে একের পর এক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন হীরার বড় বোন জান্নাতুল ফেরদৌস কাজল। কাজলের এ স্ট্যাটাসের ডাকে সারা দিয়ে ফেসবুকে হীরার মুক্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন হীরার বন্ধুরাসহ তরুণ সমাজ। সকলের শেয়ারে শেয়ারে হীরা-তমার অনেকগুলো ছবিসহ তাদের এ ভালোবাসার ঘটনা ইতিমধ্যেই ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে।

সিনেমার কাহিনীকে হার মানানো এ ঘটনাটি ঘটেছে রাজবাড়ী জেলা শহরে। হীরা শহরের দক্ষিণ ভবানীপুর এলাকার আবুল কালাম আজাদের ছেলে। সে একটি টেকনিক্যাল কলেজের চার বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

তমার (ছদ্মনাম) বাবা রাজবাড়ী জেলা পুলিশে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি জেলা শহরের নতুনবাজার এলাকায় একটি বাড়িতে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন।

হীরার বোন জান্নাতুল ফেরদৌস কাজল বলেন, গত এক বছর ধরে হীরার সঙ্গে তমার ভালোবাসার সম্পর্ক চলছিলো। গত ২৫ জানুয়ারি হীরা তমাকে আমাদের বাড়িতে আমার ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নিয়ে আসে। সেদিন আমি তমাকে বলেছিলাম- তোমার বাবা পুলিশ কর্মকর্তা আর আমার ভাই দরিদ্র পরিবারের ছেলে। এই ভালোবাসা তোমার বাবা মানবে না। সেদিন তমা আমাকে বলেছিলো- সে হীরাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না । তারপর আমি আর এ বিষয়ে তমাকে কিছুই বলিনি। তারপর থেকে তমা হীরার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই আমাদের বাড়িতে আসতো। গত ২মে তমা তার বাড়িতে রাগ করে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। এরপর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে তমার বাবাকে খবর দিয়ে এনে তমাকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর তিন দিন পর তমাকে তার বাবা তমার নানাবাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে নিয়ে অন্য এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেন। সেখান থেকে ১০মে তমা পালিয়ে এসে হীরাকে ফোন করে বলে- আমি পালিয়ে এসেছি, তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করো তাহলে আমি আত্মহত্যা করবো।

এরপর হীরা তমার কথায় রাজী হয়ে তাকে ফরিদপুর নিয়ে ১১মে নোটারী পাবলিক কর্তৃক এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে করে। এ ঘটনায় তমার বাবা হীরা ও আমার বাবা মায়ের নামে মিথ্যা অপহরণ মামলা দায়ের করেন এবং ফরিদপুর র‌্যাব ক্যাম্পে বিষয়টি জানান। মামলার পর পুলিশ আমার পঙ্গু বাবাকে ধরে নিয়ে ১২ দিন জেল হাজতে আটকে রাখে। ৩ জুন বিকেলে ফরিদপুর শহরের বায়তুল আমান এলাকা থেকে র‌্যাব হীরাকে ও তমাকে আটক করে রাজবাড়ী থানায় হস্তান্তর করেন। এরপর পুলিশ তমাকে তার পরিবারের হাতে তুলে দেয় এবং হীরাকে জেল হাজতে পাঠায়।

কাজল আরও বলেন, তমার বাবা আইনের লোক হয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে আমার ভাইকে জেলে আটকে রেখেছেন। আমাদের সংসারটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। টাকার অভাবে আমরা আমার ভাইকে জেল থেকে ছাড়াতে পারছি না।

হীরার বন্ধু দীপ্ত মণ্ডল রুপম বলেন, গত এক বছর ধরে হীরা ও তমার রিলেশন ছিলো। ওরা দু’জন দু’জনকে পাগলের মতো ভালোবাসতো, এখনো বাসে। যার স্বাক্ষী আমরা বন্ধুরা। হীরার নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে ওর জীবনটা নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা বন্ধুরা তা মেনে নিতে পারছি না। এ কারণে, আমরা ফেসবুকে ঐক্য গড়ে তুলে হীরার মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। আমাদের সাথে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরারসহ তরুণ সমাজ একাত্মতা প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার (০৮ জুন) আমরা সবাই মিথ্যা মামলা থেকে হীরাকে মুক্তির দাবিতে রাজবাড়ী প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবো।

তমার বান্ধবী সুকর্না ও সোনালী বলেন, তমাকে যখন ওর পরিবার থেকে অন্য ছেলের সঙ্গে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলো, তখন সে আত্মহত্যা করতে চাইতো। আমাদের কাছে বলতো- হীরাকে না পেলে সে বাঁচবে না। তমা ও হীরা দু’জন দু’জনকে অনেক ভালোবাসতো। অথচ এখন মিথ্যা অপহরণ মামলায় হীরাকে জেল খাটতে হচ্ছে।

হীরার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজবাড়ী সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল ইসলাম বলেন, স্বচ্ছতার সাথে মামলাটির সঠিক তদন্ত করা হচ্ছে। তমা (ছদ্মনাম) আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে, সেই প্রতিবেদন হাতে পাবার পর তদন্তকাজ আরো অগ্রসর হবে।

এ বিষয়ে কথা বলতে তমার (ছদ্মনাম) বাবার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজী হননি। পরবর্তীতে এ প্রতিবেদককে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন না করার অনুরোধ জানান তিনি।

Comments

comments


এই নিউজটি 4381 বার পড়া হয়েছে