সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় রাজবাড়ীর ৪ জনসহ নিহত ৬

ফকীর আশিকুর রহমান|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৯:৫৬ অপরাহ্ণ ,২৯ জুলাই, ২০১৭ | আপডেট: ৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ ,৩০ জুলাই, ২০১৭
পিকচার

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার আপন দুই ভাইসহ ৪ জন এবং ফরিদপুর জেলার ২ জন নিহত হয়েছেন।

শুক্রবার (২৮ জুলাই) ভোরের দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। শনিবার (২৯ জুলাই) বিকেলে উপজেলার উজানচর ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

নিহতরা হলেন- উজানচর ইউনিয়নের দরাপের ডাঙ্গা গ্রামের ওয়াহেদ আলী ব্যাপারীর ছেলে এরশাদ ব্যাপারী (৩০) ও হুমায়ুন ব্যাপারী (২৫) এবং একই ইউনিয়নের নাছের মাতুব্বর পাড়ার ওসমান খানের ছেলে কোব্বাত খান (২৫) ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের আনছার মাঝি পাড়ার ছহের মণ্ডলের ছেলে মিরাজ মণ্ডল (২২)। অপর দু’জন ফরিদপুর জেলার বলে জানা গেলেও তাদের নামপরিচয় জানা যায়নি।

নিহত এরশাদ ও হুমায়ুন ব্যাপারীর বড় ভাই মঞ্জু ব্যাপারী জানান, এরশাদ গত ৯ বছর ধরে সৌদি আরবে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনে শ্রমিকের কাজ করেন। গত বছর নভেম্বরে তিনি তার ছোটভাই হুমায়ুনকেও কাজের জন্য সৌদিতে নিয়ে যান। এরপর ডিসেম্বর মাসে এরশাদ দেশে এসে বিয়ে করে চার মাস আগে আবার সৌদি আরবে চলে যান।

তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে এরশাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। তখন এরশাদ বলেন, তিনি ও তার ছোটভাই হুমায়ুনসহ তাদের এলাকার কয়েকজ কাজের জন্য দাম্মাম থেকে আরার এলাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। এরপর শুক্রবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাত ৯টার দিকে এরশাদের সহকর্মী লিটন ও মালেক তাদের ফোন দিয়ে জানান এরশাদ ও হুমায়ুন সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় হয়ে গেছেন এরশাদ ও হুমায়ুনের মা নুরজাহান বেগম। বিলাপ করতে করতে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন তিনি। এদিকে, মেহেদীর রং না শুকাতেই স্বামীকে হারিয়ে এরশাদের স্ত্রী শিউলী বেগমও (১৮) পাগলপ্রায়।

বিলাপ করতে করতে শিউলী জানান, বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে এরশাদের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিলো। তখন এরশাদ তাকে সাবধানে থাকতে বলেছিলেন এবং আগামী কোরবানির ঈদে তিনি দেশে আসবেন বলে জানিয়েছিলেন।

এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত কোব্বাতের বাবা ওসমান বলেন, আমার তিন ছেলের মধ্যে কোব্বাত সবার ছোট। গত সাড়ে পাঁচ মাস আগে ধারদেনা করে আমি কোব্বাতকে সৌদি আরবে পাঠাই। বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) রাত ৮টার দিকে কোব্বাতের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। তখন কোব্বাত আমাকে বলেছিলো, ‘আমি আগে যে কাজ করতাম সেই কাজে বেতন কম। একটু পর নতুন একটি কাজের উদ্দেশে রওনা হবো, আমার জন্য দোয়া করবেন আব্বা’। এরপর শুক্রবার (২৮ জুলাই) রাত আড়াইটার দিকে সৌদি আরব থেকে আমার ভাতিজা শামীম ফোন করে জানায় কোব্বাত সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনায় নিহত দৌলতদিয়া ইউনিয়নের মিরাজ মণ্ডলের বাবা কৃষক ছহের মণ্ডল বলেন, আমার তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে মিরাজ তৃতীয় সন্তান। সাত মাস আগে ধার-দেনা করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে মিরাজকে সৌদি আরবে পাঠাই। ২০/২২ দিন আগে তার সঙ্গে আমার সর্বশেষ কথা হয়েছিলো। শুক্রবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাত ১২টার দিকে সৌদি আরব থেকে আমাদের পাশের গ্রামের আলমাস ফোন করে জানায় মিরাজ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

সৌদি আরব থেকে ফোনে মিরাজ মণ্ডলের চাচাতো ভাই শফিউদ্দিন সূর্য বলেন, বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) দিবাগত রাতে মিরাজসহ মোট ছয়জন একটি পিকআপভ্যানে করে দাম্মাম থেকে কাজের জন্য আরার এলাকায় যাচ্ছিলো। পথে তাদের গাড়িটি হাবরায়ে আল বাথান এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা অপর একটি পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মিরাজসহ ছয়জন মারা যান। নিহতদের মধ্যে বাকি তিনজনের বাড়ি উজানচর ইউনিয়নে এবং অপর দু’জনের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়।

সুদুর সৌদি আরবে আপনজনদের মৃত্যুতে প্রতিটি পরিবারেই চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের পাশাপাশি এলাকাবাসীর মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন প্রত্যেকটি পরিবার।

উজানচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল হোসেন ফকীর বলেন, এমন মৃত্যুতে আমার পুরো ইউনিয়নবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমি নিহতদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছি। নিহতদের মরদেহ দেশে আনতে আমার পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতার প্রয়োজন তা আমি করবো।

গোয়ালন্দ উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান হাবীব জানান, নিহতদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে আমি পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়েছি। মরদেহগুলো দেশে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।


এই নিউজটি 4712 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments