,

বিয়ের দাবিতে অনশন, অতঃপর চার লাখ টাকায় সমঝোতা!

News

আশিকুর রহমান, নিউজরুম এডিটর॥ রাজবাড়ী জেলা সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের মুচিদহ গ্রামে বিয়ের দাবিতে প্রেমিক আতিয়ার রহমান খানের (৩০) বাড়িতে দুইদিন অনশন করেছেন তার প্রেমিকা আফরোজা লিলি (২৩)।

শুক্রবার (২৪ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে আতিয়ার রহমানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় লিলি আতিয়ারের শোবার ঘরে শুয়ে আছেন। অবশেষে একইদিন রাতে পুলিশ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় চার লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিষয়টি ফয়সালা করেছেন দুই পরিবার।

আতিয়ার মুচিদহ গ্রামের মো. হান্নান খানের ছেলে। তিনি দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের শরিয়তপুর জেলা শাখায় অ্যাসিস্টেন্ট অফিসার পদে চাকরি করেন। তার প্রেমিকা লিলি একই ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামের মো. আমির আলী শেখের মেয়ে। তিনি রাজবাড়ী সরকারি কলেজে ডিগ্রী দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন।

শুক্রবার বিকেলে লিলি বলেন, পাশাপাশি এলাকায় বাড়ি হওয়ায় ২০০৬ সালে ছোটবেলায় আতিয়ারের সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর ওই বছরেই আমার পরিবার আমাকে গোয়ালন্দ উপজেলার এক ব্যক্তির সঙ্গে বাল্য বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে থাকাকালে আতিয়ার আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে সেখান থেকে চলে আসতে বলে। সেখানে দুই-তিন মাস সংসার করার পর আতিয়ারের কথামতো আমি বাড়িতে চলে আসি। এরপর আমার সেই স্বামীর সঙ্গে আমার তালাক হয়। তারপর থেকে আতিয়ারের সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক চলছিলো। আমি তাকে বিশ্বাস করে আমার সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছি। বিয়ে করার কথা বললে সে সবসময় বেকার থাকার অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে যেতো। কিন্তু, ২০১৫ সালে সে দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকে চাকরি পায়। এরপর বিয়ের কথা বললে সে বলতো খুব শিগগিরই বাড়িতে ঘর উঠাবে এরপর বিয়ে করে নিবে। আমিও তার ঘর ওঠানোর অপেক্ষায় ছিলাম।

কিন্তু, গত ১৫ দিন আগে আমি জানতে পারি আতিয়ার বিয়ে করার জন্য অন্য জায়গায় পাত্রী ঠিক করছে। এসময় আমি তাকে ফোন দিলে সে আমাকে শরিয়তপুরে তার কর্মস্থলে যেতে বলে। বুধবার (২২ নভেম্বর) সকালে আমি শরিয়তপুরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। এরপর সে ফরিদপুরে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে আমাকে বিয়ে করবে বলে তার অফিসের তিন সহকর্মীকে সঙ্গে করে আমাকে ফরিদপুরে নিয়ে আসে। ফরিদপুরে এসে সে আমাকে বলে- চলো তোমাকে বাড়িতে নিয়েই বিয়ে করবো। এরপর ওইদিন রাতেই সে তার তিন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে আমাদের এলাকার তিন রাস্তার মোড় এলাকায় এনে আমাদের চারজনকে রেখে সে সটকে পড়ে। এরমধ্যে এলাকায় ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকার লোকজন তিন রাস্তার মোড়ে ভীর জমায়। পরবর্তীতে তার তিন সহকর্মী তাকে বার বার ফোন দেওয়ার পর সে রাত তিনটার দিকে গিয়ে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। এরপর সে আমাকে বলে- আজকের রাতটা আমাদের বাড়িতে থাকো, আমি এখন শরিয়তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছি, বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় অফিস ধরতে হবে। অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে আমি তোমাকে বিয়ে করবো।

কিন্তু, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭ টার দিকে আমি তাকে ফোন দিলে সে শুধু ফোন রিসিভ করে একবার হ্যালো বলেছে। এরপর থেকে সে আর আমার ফোন রিসিভ করেনি। পরে তার পরিবারের লোকজন আমার মোবাইলটি কেড়ে নিয়ে গেছে। এখন তার পরিবারের লোকজন বলছে সে সাত-আটদিন আগে নাকি অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছে। সে যদি এখন আমাকে বিয়ে না করে তাহলে আমি তার ঘরেই আত্মহত্যা করবো।

এ বিষয়ে আতিয়ারের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, বুধবার (২২ নভেম্বর) রাতে এই মেয়ে আমার বাড়িতে এসে উঠেছে। আমার ছেলের সাথে এই মেয়ের সম্পর্ক ছিলো কি না তা আমি জানি না। আমার ছেলে আগে কখনো আমাকে কিছু বলেনি। বুধবার রাতেই আমি প্রথম বিষয়টি শুনলাম।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে কয়েকদিন আগে অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমাদের বাড়িতে ভালো ঘর নেই দেখে বউ এখনো উঠিয়ে আনিনি। এরমধ্যে এই মেয়েটি এসে এমন কাণ্ড করছে। পানি ছাড়া তাকে অন্যকিছু খাওয়ানো যাচ্ছে না।

শুক্রবার রাত সাড়ে ৭ টার দিকে লিলির বাবা আমির আলী শেখ বলেন, বিষয়টি রাজবাড়ী সদর থানার ওসি সাহেব ও বসন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের মধ্যস্ততায় ফয়সালা হয়েছে। আতিয়ারের পরিবার কিছু টাকা দিতে চেয়েছে। আমি আমার মেয়েকে তাদের বাড়ি থেকে ফেরৎ নিয়ে যাবো।

বসন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মীর্জা বদিউজ্জামান বাবু বলেন, মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটির বেশ কয়েক বছরের পুরনো সম্পর্ক। এলাকার সকলেই তাদের প্রেমের ঘটনা জানে। কিন্তু, ছেলেটি মেয়েটিকে বিয়ে করতে না চাওয়ায় মেয়েটি ছেলের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিলো। অবশেষে দুই পরিবারের সমঝোতায় টাকার বিনিময়ে বিষয়টি ফয়সালা হয়েছে।

আতিয়ারের ছোটভাই সাগর বলেন, লিলির বাবাকে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে চার লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে বিষয়টি ফয়সালা করা হয়েছে।

রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) মো. কামাল হোসেন ভূইয়া বলেন, এ বিষয়ে মামলা গ্রহণ করা হলে পরবর্তীতেও তো মিমাংসার পর্যায়েই যেতে হতো। তাই দুই পরিবারের সমঝোতায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে চার লাখ ২৫হাজার টাকায় বিষয়টি ফয়সালা করা হয়েছে। এতে দুই পরিবারের লোকজনই খুশি রয়েছেন।

এদিকে, এ বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত আতিয়ারের ব্যক্তিগত দু’টি মোবাইল নম্বরে বার বার কল দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এছাড়া, লিলির কাছে কোনো মোবাইল না থাকায় মিমাংসার বিষয়ে তার সঙ্গেও আর কোনো কথা বলা সম্ভব হয়নি।

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর