,

ভিক্ষা করে দিন কাটছে ‘৭১’ এ স্বামী হারানো ডালিম বেগমের

News

রাজবাড়ী : স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে স্বামী হারানো ডালিম বেগমের জীবন চলছে ভিক্ষা করে। দেশ স্বাধীনের পর অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হলেও এতটুকু পরিবর্তন হয়নি ডালিম বেগমের। দুই ছেলে সন্তান থাকলেও তার মুখে জোটেনি একমুঠো ভাত। আর তাই দেশ স্বাধীনের পরও প্রায় বিশ বছর ধরে ভিক্ষা করেই জীবন চলছে তার। অপর দিকে নিজের কোন জায়গা জমি না থাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেছে অন্যের বাড়িতে। যেখানে ঠিকমত তারই খাবার জোটেনা সেখানে আবার রয়েছে স্বামী হারা তার অসুস্থ মেয়ে। তার মুখেও একমুঠো ভাত দিতে সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও এখনো যেতে হচ্ছে মানুষের দাঁড়ে দাঁড়ে। সম্প্রতি ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’-এর প্রতিবেদকের কাছে সেই গল্পই শোনালেন ডালিম বেগম।

ডালিম বেগম জানান, তার স্বামী কাঠমিস্ত্রী রস্তম বেপারির বাড়ি ছিলো পাবনা জেলায়। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নদীর পাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নৌকা বানানোর সময় পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে নিহত হন তিনি। স্বামী মারা যাওয়ার সময় ডালিম বেগম ছিলেন দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জননী। তবে বয়সে তিনি ছিলেন সবে মাত্র ত্রিশ। কিন্তু ছোট ছোট সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি ডালিম বেগম। দেশ স্বাধীন হবার পর চলে আসেন রাজবাড়ীতে। শুরু করেন অন্যের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ। এক সময় ছেলে মেয়েরাও বড় হয়, ডালিম বেগমেরও বয়স বাড়ে। দুই ছেলে ও মেয়েকে বিয়েও দেন তিনি।

কিন্তু ছেলেদের ঘরে ঠাঁই হয়নি ডালিম বেগমের। দুই ছেলে যখন তার ভরনপোষন করতে অনীহা প্রকাশ করেন, তখন বয়সের ভাড়ে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় নামেন ভিক্ষাবৃত্তিতে। নিজের কোন জায়গা জমি না থাকায় তার আশ্রয় মেলে অন্যের বাড়িতে। এরমধ্যে তার মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় বিবাহিত মেয়ে কমেলা খাতুন। কমেলার স্বামী জনাব আলী চার-পাঁচটি বিয়ে করায় সেখান থেকে চলে আসেন তিনি। এর কিছুদিন পর কমেলার স্বামী মারা যান। সে কারণে স্বামীর বাড়িতে আর ফেরারও হয়নি কমেলার। এও প্রায় বিশ বছর আগের ঘটনা। দুই ছেলে ডালিম বেগমকে ফেলে দিলেও মেয়ে কমেলাকে ফেলতে পারেননি তিনি। সারাদিন ভিক্ষা করে যা পান তাই দিয়েই মা-মেয়ে দু’জন অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করতে থাকেন। এরমধ্যে নানা রোগ বাসা বাঁধে তাদের দু’জনের শরীরে। টিউমারসহ কয়েক বার অপারেশন হতে হয় দু’জনকেই।

ডালিম বেগম জানান, বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি ও তার মেয়ে রাজবাড়ী জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের চরনারায়নপুর কাকিলাদাইর এলাকায় একজনের বাড়িতে পাটকাঠি দিয়ে তৈরি ভাঙা ছাপড়া ঘরে থাকেন। কিন্তু বাড়ির মালিকের নাম ভালমতো বলতে পারেননি তিনি। তার মেয়ে কমেলা খাতুনের বয়সও প্রায় ৫৫-৫৬ বছর। কমেলার মাথায় একটু সমস্যা থাকায় সবাই তাকে পাগল বলে ডাকেন।

ডালিম বেগম বলেন, আমার মেয়ে কমেলা  কোনো কাজকর্ম করতে পারে না। আমাকেই ভিক্ষা করে ওকে খাওয়াতে হয়। মিজানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমাকে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছেন। কিন্তু বয়স্ক ভাতা দিয়ে মা-মেয়ের সংসার চলে না, তাই এখনো ভিক্ষা করি। আামার পাগল মেয়ের জন্য চেয়ারম্যান মেম্বারদের অনেকে ধরেছি। সরকার কত কার্ডই তো মানুষকে দিচ্ছে। কিন্তু কেউ আমার মেয়ের একটা কার্ড দেয় না। কতোজন কত কিছু পায়, কিন্তু আমরা কিছুই পাই না। শুধু শুনিই সরকার এখানে এটা দিচ্ছে, ওখানে ওটা দিচ্ছে। কিন্তু আমরা পাই না।

দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি এখন আর আগের মতো হাঁটতে পারিনা। কোথায় থেকে কোথায় চলে যাবে এ ভয়ে পাগল মেয়েটাকে একলা ছাড়তেও পারিনা। কিন্তু এদিকে দু’জনের সংসারও তো চলে না। আমার স্বামী মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে জীবন দিছেন। এতোটা বছর আমি বুকে চাঁপা কষ্ট নিয়ে সংগ্রাম করে বেঁচে আছি। এখন শেষ বয়সে যদি সরকার আমাকে একটু সুখে-শান্তিতে বাঁচার ব্যবস্থা করে দেন তাহলে মরেও শান্তি পাবো।

প্রিয় পাঠক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ’ এ প্রকল্পের অধীনে সারাদেশে দরিদ্র মানুষ ঘর পেয়েছে। রাজবাড়ীতে এ প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি ইউনিয়নে পাঁচটি করে ঘর দে্ওয়া হয়েছে। আবার যার জমিও নেই, ঘরও নেই তার জন্যও আছে আশ্রয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্প থাকার পরও ডালিমদের ভাগ্যে জোটেনি কিছুই। প্রিয় পাঠক, সরকার খোঁজ নিক আর না নিক ডালিমদের পাশে দাঁড়াতে পারেন আপনিও। আপনার একটু সহানুভুতি ও সহযোগিতায় বাকী জীবন ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারবেন ডালিম বেগম ও তার মেয়ে কমেলা খাতুন।

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর