,

‘প্রতিবন্ধীদের অবহেলা নয়, ওদের দরকার সহানুভূতি’

News
রওশন আরা পারভেজ

প্রতিবন্ধী শব্দটি আমাদের দেশে এখনো নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রতিবন্ধী বললেই আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে এমন একটি শিশু বা ব্যক্তি যার হাত নেই, পা নেই, কেউ কানে কম শোনে বা একেবারেই শোনে না; কেউ কথা বলতে পারে না; কেউ চোখে দেখে না বা কম দেখে; কারো বা আবার বুদ্ধি কম। এদের কথা আমরা কি কখনো ভেবেছি ?

এরা যে কতটা অসহায় অবস্থায় জীবন যাপন করে সেটা কি ভেবে দেখেছি ? একজন বাবা মায়ের কাছে একটি প্রতিবন্ধী শিশু কতটা কষ্টের কারণ হয়ে উঠতে পারে তা ওই পিতা-মাতা ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। প্রতিবন্ধীতা নিয়ে এখনো গ্রামে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। অনেকে প্রতিবন্ধীতাকে বাবা মায়ের পাপের শাস্তি বলে মনে করে থাকেন। এছাড়া সমাজে ওই পরিবারটিকে কোনঠাসা করে রাখা হয়। দেশ যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে আমরা এখনো কিছু ভুল ধারনা, কুসংস্কারকে আখড়ে ধরে আছি।

এসব কারণে প্রতিবন্ধীতা সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন এবং সাথে সাথে আমাদের মানসিকতার ও পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধীতা সম্পর্কে “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” এর ৩৯ নং ধারায় বলা আছে “প্রতিন্ধীতা অর্থ যেকোন কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ীভাবে কোন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্থতা বা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাঁধার পারস্পারিক প্রভাব যাহার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাঁধাপ্রাপ্ত হন।”

অর্থাৎ, সবার আগে প্রতিবন্ধীতা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের এই জনবহুল দেশে একটি বিরাট অংশ দখল করে আছে আমরা যাদেরকে প্রতিবন্ধী বলে থাকি তারা। এই বিরাট অংশকে বাদ দিয়ে বা অবহেলা করে সমাজে উন্নতি করা সম্ভব নয়।

১৭শ’ শতাব্দীর দিকে প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিলে তাকে মেরে ফেলে হত। বর্তমানে এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। কিছুদিন আগেও যে পরিবারে প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে সে পরিবারটিকে সবার থেকে আলাদা ভাবা হত। পরিবারের সদস্যরাও প্রতিবন্ধী শিশুটিকে সবার থেকে আড়াল করে রাখত। এতে ওই শিশুটি আরও বেশি প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠত যা তার সুস্থতার পথে বা মানসিক বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়াত। তাদেরকে পৈর্তৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হতো।

সমাজে নারী প্রতিবন্ধীদের অবস্থা আরও করুণ। তারা প্রায়ই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। আমাদের সকলকে প্রতিবন্ধী শিশু এবং তাদের পরিবারের পাশে এসে দাড়াঁতে হবে। প্রতিবন্ধীতা রোধ করতে হলে জানতে হবে কেন প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয় এবং তা প্রতিরোধের উপায় কী। যেসব জটিলতার কারণে প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয় সেগুলো সম্পর্কে জনগনের মাঝে সচেতনতা তৈরী করতে হবে। তাদেরকে বোঝাতে হবে যে, যদি জন্মের পরপরই প্রতিবন্ধী শিশু শনাক্ত করা যায় তাহলে পিতামাতা একটু সচেতন হলেই তাদের অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়।

এ লক্ষ্যে তাদের পুনবার্সনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সৃষ্টি, বিশেষ শিক্ষা উপকরণ প্রদান, জনগনকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধকরণে সহায়তা প্রদানের জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি নাগরিক কে একত্রে কাজ করতে হবে। তবেই এ সমস্যা উত্তরণের পথ কিছুটা সুগম হবে।

লেখক:  প্রভাষক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ, রাজবাড়ী।

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর