,

রাজবাড়ী-২ আসনে আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ডা. ইকবাল আর্সলানকে নিয়ে ফেসবুকে সরগরম

News
ডা. ইকবাল আর্সলান ও তার পিতা ডা. একেএম আসজাদের এই ছবিযুক্ত পোস্টারকে ঘিরেই সরগরম হয়ে উঠেছে ফেসবুক

রাজবাড়ী : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় রাজবাড়ী-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গত কয়েকদিন ধরে সরগরম অবস্থা বিরাজ করছে।

নির্বাচনী এলাকায় তাকে মাঠে দেখা না গেলেও ঢাকায় বসে নিজের সমর্থকদের দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার-প্রচারনা চালাচ্ছেন স্বাচিপের শীর্ষ এই নেতা।

তবে সম্প্রতি এই ফেসবুকেই তাকে নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, ডা. ইকবাল আর্সলানের পিতা মরহুম ডা. একেএম আসজাদ ছিলেন জামায়াতের নেতা। এমনকি তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মনোনয়ন পেয়ে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১-১৯৯৬ সাল) সংসদীয় আসন ২০৮ রাজবাড়ী-২ নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

গত ২৪ মে জামায়াতের প্রয়াত এমপি ডা. একেএম আসজাদ ও তার পুত্র ডা. ইকবাল আর্সলানের ছবিযুক্ত পোস্টারের ছবি দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে স্ট্যাটাস দেন কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শাহ্ আজিজ (Shah Aziz)। সেখানে শাহ্ আজিজ লিখেন, রাজবাড়ী-২ আসনে জামাত এমপি ডা. আসজাদের পুত্র ডা. ইকবাল আর্সলানও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান “এই নেতাদের হাতে আওয়ামী লীগ নিরাপদ নয়। এক শ্রেণির উচ্ছিষ্ট, পরিত্যক্ত ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়কেন্দ্র মাত্র।”

এর পরপরই শাহ্ আজিজের দেওয়া পোস্টটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। ইকবাল আর্সলান ও তার পিতার ছবি কপি করে নিয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীরা তাদের ব্যক্তিগত আইডিতে পোস্ট করে ডা. ইকবাল আর্সলানের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন। আবার সেই পোস্টের নিচে কমেন্ট করে অনেকেই ডা. ইকবাল আর্সলানের পক্ষে কথা বলেছেন।

ডা. ইকবাল আর্সলান ও তার পিতার ছবি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক ও বর্তমান যুবলীগ নেতা “মোহাম্মদ আবুল হাসনাত রানা”। সেখানে তিনি লিখেন- ‘রাজবাড়ী জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর রাজবাড়ী-২ আসনের দাড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচিত জামায়াতের সাবেক এমপি পুত্র কিভাবে নৌকা প্রতীক চায়? সাবেক জামায়াতের এমপির অন্য পুত্র পাংশা উপজেলা জামায়াতের প্রধান।’ আমাদের ভুলে অনেক জামায়াত শিবির সংগঠনে স্থান নিয়েছে। মহান জাতীয় সংসদেও এদের এমপি হিসাবে দেখতে চায় যারা তারা কোন ধারার আওয়ামী লীগ?

** বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন বি.কে ভাদ্র নামে এক ছাত্রলীগ নেতা। তিনি লিখেন- এরা আবার মনোনয়ন চায়। লজ্জার ব্যাপার। আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।

** বালিয়াকান্দি উপজেলা ছাত্রলীগের ফেসবুক পোস্টে লিখা হয়েছে- রাজবাড়ী-২ আসনের জামায়াত এমপি ডাঃ আসজাদের পুত্র ডাঃ ইকবাল আর্সনাল কোন সাহসে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান? তিনি কি জানেন না আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা বলেছেন, কাউকে নেতা বানানোর আগে তার পরিবারের খোঁজ খবর নেন। ডাঃ ইকবাল আর্সনালের পরিবারের খোঁজ খবর নিলে বেড়িয়ে আসবে তার বাবা ছিলেন ১৯৯১ সালে রাজবাড়ী-২ আসনের জামায়াত মনোনীত এমপি। তিনি কখনোই আওয়ামীলীগের মনোনয়ন চাওয়ার যোগ্যতা রাখে না। জামায়াত পরিবার থেকে কখনো আওয়ামীলীগ হওয়া যায় না।

এই পোস্টগুলো অনেকেই কপি করে তাদের ব্যক্তিগত আইডিতে পোস্ট করেছেন। পোস্টগুলোতে ডা. ইকবাল আর্সলানকে নিয়ে অনেকে নেতিবাচক মন্তব্য করলেও কেউ কেউ ইতিবাচক মন্তব্যও করেছেন।

** যুবলীগ নেতা আবুল হাসনাত রানার পোস্টের নিচে রাজবাড়ী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাওন মোঃ কহিনুর মন্তব্য লিখেছেন- ডাক্তার আসজাদ সম্পর্কে না জেনে কোনো খারাপ মন্তব্য করবেন না। যদি করেন তাহলে আওয়ামী লীগের ক্ষতি হবে। উপর দিকে থুথু দিলে নিজের গায়ে পড়বে, প্লিজ বিরত থাকুন।

** রাজবাড়ী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রেজাউজ্জামান খান বাবু লিখেছেন- বড় বড় জায়গায় সংসদে জামায়াতের ছেলেরা কথা বলছে।

** তারেকুর রহমান তারু নামে ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মী মন্তব্য লিখেছেন- ডা. ইকবাল আর্সলান সাহেব নেতা একদিনে হন নাই। ওনি ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, যুবলীগের নেতা ছিলেন। ৩৫বছর ধরে পেশাজীবী সংগঠনের সাথে জড়িত।

** আলী সাদমান রুদ্র নামে ছাত্রলীগের এক নেতা লিখেছেন- আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে তিনি কি ভুল করছেন? তিনি যোগ্য কি অযোগ্য সেটা আমার জানা নেই। তবে যাকে জননেত্রী স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি বানিয়েছেন, তিনি জননেত্রীর কাছে মনোনয়ন চাইলে অবাক হবার কিছু নেই। আর তার পিতার কথা যদি বলেন তাহলে বলবো, আমার নবী বলছেন পিতার কর্মে পুত্রের বিচার কিংবা পুত্রের কর্মে পিতার বিচার চলবে না।

** মাইনুল ইসলাম মইন লিখেছেন- তাই যদি হয় তাহলে তো বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী জামায়াতলীগে পরিনত হবে, তখন কি হবে ?

** ইমরুল হাসান সুমন লিখেছেন- রাজবাডী জেলার সকল দলীয় কর্মসূচিতে আমরা উপস্থিত থাকি, কই কোন দিন দলের বিপদে আপদে সুখে দুঃখে এই ডা.  ইকবাল আর্সলানকে দেখলাম নাতো। উনি কবে কোথায় আওয়ামী লীগের কোন কর্মসূচিতে রাজবাড়ী জেলায় উপস্থিত ছিলেন? ওনাকে তো কোনদিন দেখলামনা এই পোস্টার আর ফেসবুক ছাড়া। ভোটে দাড়াইতে হলে ভোটারদের কাছে আসতে হয়। দলীয় কর্মীদের সাথে মিশতে হয়, দলের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। যা এতদিন যাবত দলকে দলের কর্মীদেরকে আগলে রেখেছেন আমাদের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা জননেতা মো. জিল্লুল হাকিম, এমপি।

** মোঃ বাবু লিখেছেন-আওয়ামী লীগে কোন জামাত-বিএনপি রাজাকারদের জায়গা হবে না, এই কাউয়া, হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী আগাছা, পরগাছা মুক্ত আওয়ামীলীগ গড়তে হবে, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

** যুবলীগ নেতা সৈয়দ আল মাসুদ লিখেছেন- আসজাদ ডা. এক সময় রাজবাড়ী জেলা জামায়াতের আমির ছিলেন। এখন উনার এক ছেলে পাংশা জামায়াতের প্রধান।

** আবু হেনা মাসুকুর রহমান লিখেছেন- ডা. ইকবাল আর্সলান সারাদেশে খুবই পরিচিত মানুষ ও একজন সফল সংগঠক। উনি মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হলে রাজবাড়ী একজন পূর্ণ মন্ত্রী পাবার সম্ভাবনা আছে। উনার বাবা ভিন্ন মতের রাজনীতি করলেও তার দায় ডা. ইকবালের উপর চাপানো অনুচিত। এমনকি মরহুম ডা. আসজাদ সাহেব আমাদের এলাকার একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

** অনুপ দত্ত লিখেছেন- ডা. ইকবাল আওয়ামীলীগ এ অনুপ্রবেশ করছে শুধুই বদলা নিতে। ও আবার কনর্ফাম জামাতে ফিরে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাপ-চাচাদের অত্যাচার নির্যাতনের ঘটনার পাংশার হিন্দু সম্প্রদায় আজও ভুলে যায়নি।

** নারুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের আইডিতে লেখা হয়েছে- রাজবাড়ী-২ আসনের জামাত এমপি ডা. আসজাদের পুত্র ডা. ইকবাল আর্সনাল কোন সাহসে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান? তিনি কি জানেন না আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বলেছেন কাউ কে নেতা বানানোর আগে তার পরিবারের খোজ খবর নেন। ডা. ইকবাল আর্সনালের পরিবারের খোজ খবর নিলে বেড়িয়ে আসবে তার বাবা ছিলেন ১৯৯১ সালের এমপি। তিনি কখনোই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার যোগ্যতা রাখে না। জামাত পরিবার থেকে কখনো আওয়ামী লীগ হওয়া যায় না।

** রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জাকারিয়া মাসুদ রাজীব লিখেছেন- আমি ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে বলতে পারি যে, আমার সাবেক প্রচার সম্পাদক আবুল হাসনাত রানা ভাই যেটা বোঝাতে চেয়েছে তাহলো আওয়ামী লীগ ও জামায়েতের মধ্যে একটা আর্দশগত পার্থক্য রয়েছে। আমরা জানি বা ইতিহাস বলে বেঈমানের রক্ত কখনো ভাল হয় না, এটার প্রমান পৃথিবীতে অনেক রয়েছে। আমারা জামায়াতকে এই স্বাধীন দেশের বিপক্ষের শক্তি মনে করি। বর্তমান এদেশের অনেক মুক্তিযোদ্ধা জামায়াতের সাথে হাত মিলিয়েছে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে, আওয়ামীলীগ এ দেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি এই দলে জামায়াতের অংশগ্রহণ কখনো যুক্তিযুক্ত নয়। ডা. আসজাদ এমপি হওয়ার জন্য এদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির সাথে যুক্ত হওয়াটা জাতির সঙ্গে বেঈমানির সামিল বলে মনে করি। একজন বেঈমানের রক্ত আজ দলের সুসময়ে সুযোগ নিতে চাইলে তা দিতে হবে এটা আমার বোধগম্য নহে। সে তো তার বাবার মত দলের বিপদের দিনে অন্য দল থেকে এমপি হবার সুযোগ নিতে পারে। খন্দকার মুস্তাক কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলো, এমনকি মুজিব নগর সরকারের মন্ত্রী ছিলো। সে নিজের সাথে জাতি মুক্তির অগ্রদূত বাঙ্গালি জাতির পিতাকে হত্যা করেছিলো। এ দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিলো, যার মাসুল দিতে হচ্ছে জাতিকে আজও। যাহোক আমার প্রশ্ন হচ্ছে ১৯৯১ সালে ডা. ইকবাল সাহেবের বাবা যখন এমপি প্রার্থী ছিলেন তখন কি তিনি অবুঝ ছিলো? তিনি বিবেকবান বা জ্ঞানের অধিকারি ছিলেন না? তিনি তার বাবার জন্য কি ১৯৯১ সালে ভোট চাননি?

ছাত্রলীগের সভাপতি জাকারিয়া মাসুদ রাজীব আরো লিখেছেন, রাজবাড়ী-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য তৃনমুল থেকে এসেছেন। প্রথমে ছাত্রলীগ করেছেন তারপর, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন। দলের দু:সময়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছেন। তখন ডা. আসজাদ জামায়েত থেকে মনোনয়ন নিলেন কেনো? আর তখন ডা. ইকবাল তার বাবাকে বুঝিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নেওয়াতে পারতেন না? তিনি এতোদিন দলে কাজ না করে সুসময়ের দুধের মাছি হয়েছেন? গ্রাম্য প্রবাদ আছে খেটে মরে রাম গোপাইলে বউ কয় আমি কপাইলে..।

এছাড়াও ফেসবুকে বিভিন্ন জনের মন্তব্যে বলা হয়, ডা. ইকবাল আর্সলানের পিতার মৃত্যুর পরও জামায়াতের হাইকমান্ডের সঙ্গে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তার এক পিতা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পিস কমিটির নেতা ছিলেন। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তিনি নিহত হন। তার আরেক চাচা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার এক চাচাতো ভাই বর্তমানে পাংশা উপজেলা জামায়াতের আমীর। তার বড় ভাইও জামায়াতের ত্যাগী নেতা। ১৯৯১ সালে ডা. একেএম আসজাদ জামায়াতের মনোনয়নে রাজবাড়ী-২ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। সে সময় তার নির্বাচনী জনসভায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী উপস্থিত থেকে ভোট চান।

যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ আবুল হাসনাত রানা’র ফেসবুকের উক্ত পোস্টে এ খবর লেখা পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক লাইক ও শতাধিক কমেন্ট এবং শেয়ার লক্ষ্য করা গেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হওয়ায় বিষয়ে কথা বলতে ২৫ মে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে ডা. ইকবাল আর্সলানের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে কয়েকবার কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর