,

শিক্ষক ও চিকিৎসকের গাফিলতিতে প্রাণ হারালো আলিম!

News
এই স্লিপার খেলনাটির নিচে চাপা পড়ে নিহত হয় শিশু আলিম।

রাজবাড়ী :  রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলাদীপুর আরসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘খেলনা  স্লিপারের’ নিচে চাপা পড়ে আব্দুল আলিম শেখ (০৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, বিদ্যালয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে অকালে প্রাণ দিতে হলো আলিমকে।

শনিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

আলিম রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের আলাদীপুর মধ্যপাড়া গ্রামের মামুন শেখ ওরফে কছিমদ্দিনের ছেলে। সে আলাদীপুর আরসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ছিলো।

কান্নাজড়িত কন্ঠে আলিমের বাবা কছিমদ্দিন বলেন, ‘সকাল ৯ টার দিকে আমি আমার ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আলাদীপুর বাজারে আসি। বাজারের পাশেই স্কুলটি। এরমধ্যে খবর পাই আমার ছেলে স্কুলের খেলনা স্লিপারের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়েছে। তাৎক্ষনিক আমি স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। সে সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ছিলেন ডা. মনিজা। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে ৪০-৪৫ মিনিট পর্যন্ত ডাকাডাকি করেলেও কোনো চিকিৎসক আমাদের ডাকে সারা দেয়নি। ডা. মনিজার কাছে আমরা বার বার গেলেও ওই ডা. তখন মোবাইল ফোন কানে নিয়ে গল্প করায় ব্যস্ত ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি বার বার ডা. মনিজার কাছে কাকুতি-মিনতি করেছিলাম আমার ছেলেটিকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। তখনও আমার ছেলে কথা বলছিলো। কিন্তু ডা. মনিজা কোনো গুরুত্ব দেয়নি। বিনা চিকিৎসায় শেষ পর্যন্ত চলে গেল আমার ছেলেটি’- বলেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন কছিমদ্দিন।

স্কুল কর্তৃপক্ষের দিকেও গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন কছিমদ্দিন। তিনি বলেন, ‘স্কুলের যে খেলনা স্লিপারটির নিচে আমার ছেলে চাপা পড়েছে, সেটি ঠিকমতো বসানো ছিলোনা। সিমেন্ট দিয়ে জায়গা বানিয়ে তারপর ক্লাম্প ও নাট দিয়ে ওই খেলনাটি বসানোর নিয়ম। কিন্তু, খেলনাটি ছিলো একদম আলগা। যে কারণে অন্য বাচ্চারা খেলার সময় আমার ছেলে ওখানে গিয়ে দাড়ানো মাত্রই তার উপর চাপা পড়ে খেলনাটি। স্কুল কর্তৃপক্ষ একটু সচেতন হলেই, আমার বাবাটা আজ বেঁচে থাকতো।’

আলাদীপুর আরসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিনয় কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘স্লিপার খেলনাটি আলীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শওকত হাসান শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে দিয়েছেন। শুক্রবার (২৮ সেপ্টেম্বর) খেলনাটি স্কুলে এনে তারা রেখে গেছেন। স্কুল বন্ধের দিন হওয়াতে আমরা বিষয়টি জানতাম না। যে কারণে খেলনাটি ওভাবেই আলগা অবস্থায় ছিলো। সকালে স্কুলে এসে দেখি শিশুরা খেলছে। এ সময় আলিম পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল। হঠাৎ খেলনাটি উল্টে আলিমের ওপর পড়ে। এতে আলিম আহত হয়। আমরা তাকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি বিভাগে ভর্তির স্লিপ, এক্স-রে ও বিভিন্ন অজুহাতে সময় বিলম্ব করে চিকিৎসক মনিজা। ওই সময় নারী চিকিৎসক মনিজাকে বারবার ডাকলেও আলিমকে দেখতে আসেননি। এভাবে ৪০-৪৫ মিনিট জরুরি বিভাগের বেডে ছটফট করে মারা যায় আলিম। চিকিৎসকের অবহেলার কারণে শিশু আলিম মারা গেছে। চিকিৎসক মনিজার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

চিকিৎসকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করলেও নিজেদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শুধুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করেছেন এই শিক্ষক।

প্রত্যক্ষদর্শী বেশ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, ‘আলগা স্লিপারে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সামনেই শিশুরা খেলা করছিলো। তখন যদি শিক্ষকরা শিশুদের নিষেধ করতো তাহলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটতো না। এই দুর্ঘটনার দায় শিক্ষকরা এড়াতে পারেন না।’

আলীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. শওকত হাসান বলেন, ‘স্লিপার খেলনাটি আমি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ওই স্কুলে দিয়েছি। শুক্রবার খেলনাটি স্কুলে নিয়ে রাখা হয় সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টারের পর ক্লাম্প করে ভালোভাবে সেট করার জন্য। আজ-কালের মধ্যেই কাজটি করা হতো। কিন্তু কাজ সম্পন্ন করার আগেই শিশুরা সেটির ওপরে চড়ে খেলা শুরু করে দেয়। যে কারণে অনাকাঙ্খিত এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।’

এদিকে, এ ঘটনায় আলিমের স্বজনরা চিকিৎসকের গাফিলতির অভিযোগ তুলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আলী আহসান তুহিন বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি হাসপাতালে ছিলাম না। বিষয়টি শুনে হাসপাতালে এসে শিশুটির সব ফাইলপত্র দেখেছি। এক্স-রে পরীক্ষায় দেখা যায় শিশুটির কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। সেই সঙ্গে তার পেটের নিচের অংশ ফুলে যায়। এমন রোগীর চিকিৎসা হলো ভেন্টিলেশন। যা আমাদের এখানে নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে যদি ভেন্টিলেশন বা আইসিইউ সিস্টেম থাকতো তাহলে আজ এমন ঘটনা ঘটতো না। রোগীর স্বজনরা ওই সময়ে দায়িত্বরত এক নারী চিকিৎসকের নামে অভিযোগ দিয়েছেন। ঘটনা তদন্তে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। অভিযোগ পেলে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর