,

সর্বশেষ :
রাজবাড়ীর জরিনা বেগমের চোখের অপারেশনের জন্য সাহায্যের আবেদন মেয়েকে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে বিক্রির সময় ধরা পড়লো বাবা! বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিশুদের সঙ্গে কেক কাটলেন রাজবাড়ীর এসপি রাজবাড়ী সদরে জনসমর্থনে এগিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ভিপি পিয়াল ৮ মাসেও গ্রেফতার হয়নি কলেজছাত্র রুমানের খুনিরা! ‘সচিব পরিচয়ে ফোন নম্বর সংগ্রহ, সর্বহারা পরিচয়ে চাঁদা দাবি’ রাজবাড়ীতে ৪ টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ ২ চরমপন্থী নেতা গ্রেফতার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দমোড়ে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত রাজবাড়ীতে ইয়াবাসহ ৫ মাদক ব্যবসায়ী আটক রাজবাড়ীতে ১২% মূল্য ছাড়ে আইপিএস বিক্রি করছে ‘রানা ইলেকট্রনিক্স সার্ভিসিং সেন্টার’

বাপ-বেটার লড়াই!

News

রাজবাড়ী : বাবা-ছেলে দু’জনের হাতেই লাঠি। দু’জন দু’জনকে পরাস্থ করতে চলিয়ে যাচ্ছেন তুমুল লড়াই। কয়েক হাজার মানুষ এ লড়াই দেখছেন আর হাতে হালি দিচ্ছেন।

শুক্রবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বাবা ও ছেলের এমই এক লড়াই হয়েছে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কেওয়াগ্রামের লুৎফর রহমান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। তবে এ লড়াই বাস্তবের নয়। লাঠিবাড়ি খেলার ছলে এমন লড়াইয়ে মেতে ওঠেন চাঁদ আলী মোল্লা (৪৫) ও তার ছেলে সজল হোসেন (১২)।

খেলার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদ আলী মোল্লার সঙ্গে কথা হয় ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’-এর। তিনি জানালেন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিবাড়ি খেলা নিয়ে তার অতীত ও ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা।

তিনি জানান, তার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার জালসুকা গ্রামে। লাঠিবাড়ি খেলা তার বাপ-দাদার ঐতিহ্যের খেলা। জ্ঞান হবার পর থেকেই তিনি বাবা তোফাজ্জেল হোসেন মোল্লাকে এই খেলা খেলতে দেখেছেন। তবে বাবাকে বেশি সময় পাননি তিনি। ১২ বছর বয়স থেকে লাঠিবাড়ি খেলা শুরু তার। এর বছর তিনেক পরেই মারা যান তার বাবা। এরপর থেকে শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। কৃষিকাজের পাশাপাশি বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী এই খেলা রপ্ত করেন পুরদমে। বর্তমানে তিনি লাঠিবাড়ি খেলার একটি দলের প্রধান। নিজের নামেই দলটি পরিচালনা করেন তিনি। নিজের দুই ছেলেসহ ২০ জন সদস্য রয়েছেন তার দলে। বড় ছেলে এসএসসি পাশ করার পর আর পড়ালেখা করেনি। ছোট ছেলে তাদের এলাকার একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ছেলেদের দলে নিয়েছেন বলে জানান তিনি। চাঁদ আলী মোল্লা বলেন, ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর মধ্যে লাঠিবাড়ি খেলা অন্যতম। এই খেলা দেখার প্রতি মানুষের এখনো অনেক আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে এই খেলা। তাই বাপ-দাদার ঐতিহ্যের এই খেলাকে ধরে রাখতে নিজের দুই ছেলে সুরুজ হোসেন (২২) ও সজল হোসেনকে (১২) দলে এনেছি।’

চাঁদ আলীর কাছে প্রশ্ন ছিলো আয়-রোজগার কেমন হয় এই খেলায় ? বললেন, ‘আয়-রোজগারের আশায় খেলা খেলিনা। আমার দলে যারা রয়েছেন তারা সবাই কৃষিকাজ বা অন্য কোন পেশার সঙ্গে যুক্ত। বছরে তিন-চার মাস (শীতের সময়টা) খেলা চলে। মূলত ঐতিহ্য ধরে রাখতে ও নেশা থেকে খেলা খেলি। মাসে তিন-চারটা খেলা হয়। একদিন কোথাও দলসহ খেলা দেখাতে গেলে যাতায়াত ভাড়াসহ সব মিলিয়ে দশ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু কোথাও আমরা টাকা চেয়ে নেইনা। মানুষ দাওয়াত করে নেন। সম্মান দেন, উপহার দেন। কখনও দশ হাজারের বেশিও উপহার পাই। কখনও কমও পাই।’

দেখে তো মনে হচ্ছে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ খেলা। এই ঝুঁকির মধ্যে আপনার ছেলেদের আনলেন কেন ? এমন প্রশ্নে চাঁদ আলী বলেন, ‘আমরা প্রায় বিশ আইটেমের খেলা দেখাই। প্রতিটি খেলাই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকসময় খেলতে গিয়ে আহত হয়ে হাসপতালে চিকিৎসাও নিতে হয়। তারপরেও আমার ছেলেদের এনেছি যাতে ওরা বংশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে। আর সাহস নিয়ে বাঁচতে পারে। আর মাঠে আমি যখন ছেলেদের সাথে লাঠি নিয়ে লড়াই করি। তখন দর্শকরা বেশি আনন্দ পায়। বেশি হই-হুল্লর করে, হাতে তালি দেয়। আমরাও খুব উপভোগ করি।’

চাঁদ আলীর ছোট ছেলে সজল হোসেনের কাছে প্রশ্ন ছিলো এইটুকু বয়সে এরকম ঝুঁকিপূর্ণ খেলা খেলতে ভয় লাগে না? বললো, ‘আট বছর বয়স থেকে আমি লাঠিবাড়ি খেলা খেলি। প্রথম প্রথম ভয় লাগতো। এখন আর ভয় লাগে। আর আমার স্বপ্ন আর্মিতে চাকরি করা। তাই ভয়ভীতি সব দূর করে ফেলেছি।’

ছোট্ট সজলের মধ্যেও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। বললো, ‘বাবার কাছে দাদার গল্প শুনেছি। আমি চাই লাঠিবাড়ি খেলাটাকে আমি ধরে রাখবো। আমার ছেলে সন্তান হলে তাকেও শিখাবো। আর্মির চাকরি পেলেও এই খেলা আমি রপ্ত করে যাবো।’লুৎফর রহমান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ঐত্যিহ্যবাহী এই লাঠিবাড়ি খেলার আয়োজন করে ‘প্রান্তিক জনকল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আনওয়ারউজ্জামান বলেন, ‘চাঁদ আলী ও তার ছোট ছেলে সজল যখন লাঠিবাড়ি খেলার ছলে লড়াই করে। তখন দর্শকরা বাপ-বেটার লড়াই জমছে বলে স্লোগান ও হাতেতালি দিতে থাকে। বিষয়টি অনেক ভালো লাগে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই লাঠিবাড়ি খেলাটি আরও সুন্দর হবে এবং ভালো ভালো খেলোয়ারও তৈরি হবে।’

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শাহ মো. রুহুল কবির বলেন, ‘লাঠিবাড়িসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সকল খেলাগুলো আমরা নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আলোকিত সমাজ গঠনে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কাজ করে আসছি। তারমধ্যে মাদক বিরোধী কার্যক্রম, কৃষকদের বিনাসুদে কৃষি ঋণ প্রদান, দরিদ্র মানুষদের আর্থিক সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও চাকরি প্রদান উল্লেখযোগ্য।’

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর