,

সর্বশেষ :
ঢাকাস্থ খানখানাপুর সমিতির উদ্যোগে গুণীজন ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান রাজবাড়ীর বসন্তপুরের মাদক ব্যবসায়ী ছবদুল র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ‌’মানবতার জয়’ এর উদ্যোগে হতদরিদ্রদের মধ্যে ঈদ খাদ্য সামগ্রী বিতরণ রাজবাড়ীর মুলঘরের আদর্শ রাজনীতিবিদ রইস উদ্দিন মিয়া আর নেই দৌলতদিয়ায় এক মাদক ব্যবসায়ী ও চার মাদকসেবী আটক রাজবাড়ীর বসন্তপুর ইউনিয়নে ভাতা ভোগীদের বই বিতরণ অ্যাডভোকেট সুদীপ্ত গুহ ও সিএসআই তাজ উদ্দিনের দ্বন্দ্বের অবসান যুবকের দুই হাত বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় গ্রেফতার ১, চাপাতি উদ্ধার কবিরাজ’ই চিকিৎসক; বিশ্বাসকে পুঁজি করে দিনের পর দিন ধরে চলছে অপচিকিৎসা রাজবাড়ীর বসন্তপুরে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী মতিয়ার গ্রেফতার

বাপ-বেটার লড়াই!

News

রাজবাড়ী : বাবা-ছেলে দু’জনের হাতেই লাঠি। দু’জন দু’জনকে পরাস্থ করতে চলিয়ে যাচ্ছেন তুমুল লড়াই। কয়েক হাজার মানুষ এ লড়াই দেখছেন আর হাতে হালি দিচ্ছেন।

শুক্রবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বাবা ও ছেলের এমই এক লড়াই হয়েছে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কেওয়াগ্রামের লুৎফর রহমান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। তবে এ লড়াই বাস্তবের নয়। লাঠিবাড়ি খেলার ছলে এমন লড়াইয়ে মেতে ওঠেন চাঁদ আলী মোল্লা (৪৫) ও তার ছেলে সজল হোসেন (১২)।

খেলার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদ আলী মোল্লার সঙ্গে কথা হয় ‘রাজবাড়ী নিউজ২৪.কম’-এর। তিনি জানালেন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিবাড়ি খেলা নিয়ে তার অতীত ও ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা।

তিনি জানান, তার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার জালসুকা গ্রামে। লাঠিবাড়ি খেলা তার বাপ-দাদার ঐতিহ্যের খেলা। জ্ঞান হবার পর থেকেই তিনি বাবা তোফাজ্জেল হোসেন মোল্লাকে এই খেলা খেলতে দেখেছেন। তবে বাবাকে বেশি সময় পাননি তিনি। ১২ বছর বয়স থেকে লাঠিবাড়ি খেলা শুরু তার। এর বছর তিনেক পরেই মারা যান তার বাবা। এরপর থেকে শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। কৃষিকাজের পাশাপাশি বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী এই খেলা রপ্ত করেন পুরদমে। বর্তমানে তিনি লাঠিবাড়ি খেলার একটি দলের প্রধান। নিজের নামেই দলটি পরিচালনা করেন তিনি। নিজের দুই ছেলেসহ ২০ জন সদস্য রয়েছেন তার দলে। বড় ছেলে এসএসসি পাশ করার পর আর পড়ালেখা করেনি। ছোট ছেলে তাদের এলাকার একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ছেলেদের দলে নিয়েছেন বলে জানান তিনি। চাঁদ আলী মোল্লা বলেন, ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর মধ্যে লাঠিবাড়ি খেলা অন্যতম। এই খেলা দেখার প্রতি মানুষের এখনো অনেক আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে এই খেলা। তাই বাপ-দাদার ঐতিহ্যের এই খেলাকে ধরে রাখতে নিজের দুই ছেলে সুরুজ হোসেন (২২) ও সজল হোসেনকে (১২) দলে এনেছি।’

চাঁদ আলীর কাছে প্রশ্ন ছিলো আয়-রোজগার কেমন হয় এই খেলায় ? বললেন, ‘আয়-রোজগারের আশায় খেলা খেলিনা। আমার দলে যারা রয়েছেন তারা সবাই কৃষিকাজ বা অন্য কোন পেশার সঙ্গে যুক্ত। বছরে তিন-চার মাস (শীতের সময়টা) খেলা চলে। মূলত ঐতিহ্য ধরে রাখতে ও নেশা থেকে খেলা খেলি। মাসে তিন-চারটা খেলা হয়। একদিন কোথাও দলসহ খেলা দেখাতে গেলে যাতায়াত ভাড়াসহ সব মিলিয়ে দশ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু কোথাও আমরা টাকা চেয়ে নেইনা। মানুষ দাওয়াত করে নেন। সম্মান দেন, উপহার দেন। কখনও দশ হাজারের বেশিও উপহার পাই। কখনও কমও পাই।’

দেখে তো মনে হচ্ছে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ খেলা। এই ঝুঁকির মধ্যে আপনার ছেলেদের আনলেন কেন ? এমন প্রশ্নে চাঁদ আলী বলেন, ‘আমরা প্রায় বিশ আইটেমের খেলা দেখাই। প্রতিটি খেলাই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকসময় খেলতে গিয়ে আহত হয়ে হাসপতালে চিকিৎসাও নিতে হয়। তারপরেও আমার ছেলেদের এনেছি যাতে ওরা বংশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে। আর সাহস নিয়ে বাঁচতে পারে। আর মাঠে আমি যখন ছেলেদের সাথে লাঠি নিয়ে লড়াই করি। তখন দর্শকরা বেশি আনন্দ পায়। বেশি হই-হুল্লর করে, হাতে তালি দেয়। আমরাও খুব উপভোগ করি।’

চাঁদ আলীর ছোট ছেলে সজল হোসেনের কাছে প্রশ্ন ছিলো এইটুকু বয়সে এরকম ঝুঁকিপূর্ণ খেলা খেলতে ভয় লাগে না? বললো, ‘আট বছর বয়স থেকে আমি লাঠিবাড়ি খেলা খেলি। প্রথম প্রথম ভয় লাগতো। এখন আর ভয় লাগে। আর আমার স্বপ্ন আর্মিতে চাকরি করা। তাই ভয়ভীতি সব দূর করে ফেলেছি।’

ছোট্ট সজলের মধ্যেও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। বললো, ‘বাবার কাছে দাদার গল্প শুনেছি। আমি চাই লাঠিবাড়ি খেলাটাকে আমি ধরে রাখবো। আমার ছেলে সন্তান হলে তাকেও শিখাবো। আর্মির চাকরি পেলেও এই খেলা আমি রপ্ত করে যাবো।’লুৎফর রহমান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ঐত্যিহ্যবাহী এই লাঠিবাড়ি খেলার আয়োজন করে ‘প্রান্তিক জনকল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আনওয়ারউজ্জামান বলেন, ‘চাঁদ আলী ও তার ছোট ছেলে সজল যখন লাঠিবাড়ি খেলার ছলে লড়াই করে। তখন দর্শকরা বাপ-বেটার লড়াই জমছে বলে স্লোগান ও হাতেতালি দিতে থাকে। বিষয়টি অনেক ভালো লাগে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই লাঠিবাড়ি খেলাটি আরও সুন্দর হবে এবং ভালো ভালো খেলোয়ারও তৈরি হবে।’

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শাহ মো. রুহুল কবির বলেন, ‘লাঠিবাড়িসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সকল খেলাগুলো আমরা নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আলোকিত সমাজ গঠনে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কাজ করে আসছি। তারমধ্যে মাদক বিরোধী কার্যক্রম, কৃষকদের বিনাসুদে কৃষি ঋণ প্রদান, দরিদ্র মানুষদের আর্থিক সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও চাকরি প্রদান উল্লেখযোগ্য।’

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর