,

সাংবাদিক বাবু মল্লিকের দখলে থাকা সরকারী সম্পত্তি উদ্ধারের দাবীতে ভূমি সচিবের নিকট অভিযোগ

News

রাজবাড়ী : জাল দলিল সৃজনের মাধ্যমে সরকারী খাস-ভিপিসহ রেলওয়ের সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে ডিক্লারেশন বাতিল হওয়া স্থানীয় সাপ্তাহিক অনুসন্ধান পত্রিকার সম্পাদক আবু রেজা আশরাফুল মাসুদ বাবু মল্লিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও বেদখল হওয়া সরকারী সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর গণদরখাস্ত দাখিল করা হয়েছে।

অভিযোগের অনুলিপি ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার, রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, এনএসআই’র উপ-পরিচালক, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার(ভূমি), দুর্নীতি দমন কমিশন ফরিদপুরের উপ-পরিচালক, রাজবাড়ী প্রেসক্লাবের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক এবং ডিজিএফআই’র ফিল্ড অফিসারকে প্রদান করা হয়েছে।

৯ই এপ্রিল অভিযোগকারীরা রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক) মোহাম্মদ আশেক হাসানের নিকট ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অভিযোগের অনুলিপি প্রদান করেন। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) আলমগীর হুছাইন উপস্থিত ছিলেন।

রাজবাড়ীর পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের ২২জন ব্যক্তির স্বাক্ষরিত গণদরখাস্তের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজবাড়ী পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের মধ্যে স্টেশন মসজিদের পিছনে আর.এস-১৩৭৭ নং দাগে ৬৬৯ লিংক জমি যার এস.এ খতিয়ান নং-২১৭ বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। উক্ত জমিটির এস.এ রেকর্ডীয় মালিক থাকেন জনৈক ছমির সেক, আমিন সেক উভয় পিতা-বুল্লু সেক ওরফে বুল্লু ড্রাইভার ও তাদের সহোদর বোন জয়নব বিবি জং ছয়কী ওরফে ছয়ফর এদের নামে স্বত্ব দখল হয় ও থাকে। উক্ত সম্পত্তিতে বুল্লু সেক ওরফে বুল্লু ড্রাইভার তার পুত্র-কন্যাদের নামে ক্রয় করে বাড়ী-ঘর নির্মাণ করে বসবাস করতেন। উল্লেখিত ব্যক্তিগণ সকলেই অবাঙ্গালী(বিহারী) ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় উল্লেখিত ব্যক্তিগণ মৃত্যুবরণ করলে জনৈক আবেদ আলী যিনি ওই বাড়ীতে বাজার-সদাই করতেন এবং ফাই-ফরমাস খাটতেন। আবেদ আলী একজন স্থানীয় বাঙ্গালী ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর তিনি রাজবাড়ী বাজারে কুলফি মালাই বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আবেদ আলী যেহেতু একজন বাঙ্গালী ছিলেন সেহেতু তিনি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহু চেষ্টা তদীবর করেও ছমির, আমিন এবং জয়নবের মৃত্যুতে কোন বৈধ ওয়ারিশ সার্টিফিকেট রাজবাড়ী পৌরসভা হতে উত্তোলন করতে পারেন নাই। উল্লেখিত সম্পত্তিটি পি.ও ১৬/১৯৭২ নং অধ্যাদেশ বলে এ/পি-১০/১৯৭২ কেসে অন্তর্ভুক্ত হয়। আবেদ আলী জীবদ্দশায় উল্লেখিত সম্পত্তি নিজ নামে পত্তন করতে পারেন নাই এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নিকট বিক্রির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। আবেদ আলীর মৃত্যুর পর বাবু মল্লিক রাজবাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র তোফাজ্জেল হোসেনের সময়ে তার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে তাকে ভুল বুঝিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ১৮/০৩/২০১৪ইং তারিখে তার কাছ থেকে একটি ভুয়া ওয়ারিশ সার্টিফিকেট হাসিল করে আবেদ আলীর ওয়ারিশদের নিকট হতে একখানা অবৈধ বায়নাপত্র এবং অবৈধ পাওয়ার অব এটর্নী গ্রহণ করে প্রথমে সহকারী কমিশনার(ভূমি), রাজবাড়ী সদর এর নিকট হতে নাম পত্তনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে উক্ত সম্পত্তির ভুয়া ওয়ারিশ সার্টিফিকেট এবং জাল-জালিয়াতিপূর্ণ কাগজপত্র তৈরী করে রাজবাড়ীর বিজ্ঞ ১নং যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানী-১৯১/২০১৭ নং মোকদ্দমা দায়ের করেন। উল্লেখিত সম্পত্তি হাল বি.এস জরীপের বি.এস রেকর্ডে সরকারের পক্ষে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের নামে ১নং খাস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত হয়ে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হলে বাবু মল্লিক রাজবাড়ীর বিজ্ঞ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে ৮৮/২০১৭নং মামলা দায়ের করেন, যা বিচারাধীন রয়েছে। গত ১৮/০৩/২০১৪ইং তারিখে রাজবাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়রের দেয়া ছমির, আমিন ও জয়নবের নামীয় ওয়ারিশ সার্টিফিকেট বর্তমান মেয়র মহম্মদ আলী চৌধুরী অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করে প্যানেল আইনজীবীদের আইনগত মতামত গ্রহণ করে ইং ০২/০৮/২০১৮ইং তারিখে উক্ত ভুয়া ওয়ারিশ সার্টিফিকেট বাতিল করে দেন।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, রাজবাড়ী শহরের লক্ষ্মীকোল মৌজার এস.এ-৮৮২ নং খতিয়ান আর.এস-৪৫২নং দাগে ৮৪ শতাংশ জমির মধ্যে ৪৮ শতাংশ জমি বাংলাদেশ সরকারের সড়ক ও জনপথ বিভাগের অনুকূলে অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি। উক্ত সম্পত্তি যথারীতি সড়ক ও জনপথ বিভাগ এল.এ-৬/৬৩-৬৪ নং কেসে যথারীতি আইন অনুযায়ী ০১/০৩/১৯৬৫ তারিখের দখল প্রাপ্ত হয়ে ২১/০৮/১৯৬৯ তারিখে সরকারী গেজেটে প্রকাশিত হলে এবং যথারীতি মালিকগণকে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান পূর্বক সড়ক ও জনপথ বিভাগ তাদের নিজ নিয়ন্ত্রণে ভোগ-দখলে ছিলেন। পরবর্তীকালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ উল্লেখিত সম্পত্তি ০৫/০৪/৮৮ তারিখে রাজবাড়ী পৌরসভাকে পৌরসভার রাস্তা উন্নয়ন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রদান করে। রাজবাড়ী পৌরসভা উক্ত জায়গার পাশে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য একটি পানির পাম্প স্থাপন করে উল্লেখিত সম্পত্তি ভোগ-দখল করে। বাবু মল্লিক উক্ত সম্পত্তির ভুয়া ওয়ারিশ সার্টিফিকেট ও দলিল দস্তাবেজ তৈরী করে নিজের নামে ও তার স্ত্রীর নামে জাল দলিল সৃজন করেছেন এবং কিছু রেকর্ডীয় মালিকের ওয়ারিশের নাম দিয়ে রাজবাড়ীর যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতে ৯৫/২০১২ দেওয়ানী মোকদ্দমা দায়ের করে উল্লেখিত সম্পত্তি নিজ দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি পূবালী ব্যাংক লিঃ রাজবাড়ী শাখায় মর্টগেজ দেখিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা ঋণ গ্রহণ করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়, রাজবাড়ী বাজারের স্টেশন রোডস্থ কালী মন্দির সংলগ্ন আর.এস-১১৫২ নং খতিয়ানভুক্ত আর.এস-১৩৯৬, ১৩৯৮ নং দাগে একটি রাস্তা থাকে। যা বাবু মল্লিক জাল দলিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করে উক্ত রাস্তাটি বন্ধ করে একটি আধা পাকা ঘর নির্মাণ করেছে। উল্লেখিত সম্পত্তিটি বাবু মল্লিক ভিপি দপ্তর থেকে পূর্বে  নিজের নামে লীজ গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জমিটি আত্মসাৎ করেছেন।

বাবু মল্লিক বর্তমানে রাজবাড়ী রেলওয়ে স্টেশন মাস্টারের অফিসের পিছনে মূল্যবান জায়গা কোন প্রকার লীজ গ্রহণ না করে সেখানে একটি পাকা বিল্ডিং বেআইনীভাবে নির্মাণ করেছে।

তাছাড়া জনৈক আঃ আজিজ(সাবেক খাদ্য কর্মকর্তা) এর একতা স’মিল ও তার বসতবাড়ী নিয়ে পূবালী ব্যাংক রাজবাড়ী শাখা রাজবাড়ীর বিজ্ঞ অর্থ ঋণ আদালতে মামলা হলে সেই মামলার সমন নোটিশ, রেজিঃ চিঠি গায়েব করে ব্যাংকের নামে একতরফা ডিক্রি করিয়ে নামমাত্র মূল্যে পূবালী ব্যাংক লিঃ রাজবাড়ী শাখার সাথে যোগসাজশে নিলামে খরিদ করেন। কিন্তু সরেজমিনে দখল নিতে পারেন নাই। বাবু মল্লিক উক্ত সম্পতির ব্যাংকে মর্টগেজ রেখে কয়েক লক্ষ টাকা ঋণ গ্রহণ করেছেন ।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাবু মল্লিক ‘অনুসন্ধান’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালাতেন। দীর্ঘদিন যাবৎ নিয়মিত প্রকাশ না করায় সম্প্রতি রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক উক্ত পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করেছেন। অভিযোগকারীরা বাবু মল্লিকের এহেন কার্যক্রম থেকে নিষ্কৃতি এবং কোটি কোটি টাকার সরকারী সম্পত্তি আত্মসাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবী করেছেন।

বাবু মল্লিকের মামলা-মোকদ্দমা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজবাড়ী জজ কোর্টের সরকারী কৌসুলী(জিপি) এডঃ মোঃ আনোয়ার হোসেন জানান, বাবু মল্লিক গং বাদী হয়ে রাজবাড়ীর বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতে ২০/০৯/২০১২ইং তারিখে ৯৫/২০১২ নং মোকদ্দমা দায়ের করে। যার ১নং বিবাদী রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র এবং ৫নং বিবাদী জেলা প্রশাসক। উক্ত মোকদ্দমাটি আগামী ১১/০৪/২০১৯ইং তারিখে পি.এইচ এর জন্য দিন ধার্য্য আছে।

রাজবাড়ী শহরের স্টেশন মসজিদের পিছনে আর.এস-১৩৭৭ নং দাগে ৬৬৯ লিংক জমি সংক্রান্তে ঝর্ণা বেগম বাদী হয়ে রাজবাড়ীর বিজ্ঞ সদর সহকারী জজ আদালতে ১৮/০৩/২০১৫ইং তারিখে দেওয়ানী ৩৪/২০১৫ নং মোকদ্দমা দায়ের করে। ওই মোকদ্দমায় বাবু মল্লিক আমমোক্তার নিযুক্ত হয়ে মোকদ্দমা পরিচালনাকালে মোকদ্দমাটি বদলী হয়ে বিজ্ঞ যুগ্ম-জেলা জজ ১ম আদালতে বিচারের নিমিত্তে প্রেরিত হয়। যার মোকদ্দমা নং-দেওয়ানী ১৯১/২০১৭ যা ১৩/০৫/২০১৯ইং তারিখে এফ.পি.এইচ ও বিবাদী পক্ষের দাখিলী অর্ডার ৭রুল ১১ এর দরখাস্ত শুনানীর জন্য দিন ধার্য্য আছে। উল্লেখিত দেওয়ানী ১৯১/২০১৭নং মোকদ্দমায় তপশীলভুক্ত সম্পত্তি বাবদে জেলা প্রশাসক বাদী হয়ে রাজবাড়ীর বিজ্ঞ যুগ্ম-জেলা জজ ১ম আদালতে ০৪/১১/২০১৭ইং তারিখে দেওয়ানী ২২৫/২০১৭ নং মোকদ্দমা দায়ের করেন। যা ১৩/০৫/২০১৯ তারিখে বিবাদী পক্ষের দাখিলী অর্ডার ৭ রুল ১১ এর দরখাস্ত শুনানীর জন্য দিন ধার্য্য আছে। ঝর্ণা বেগম গং বাদী হয়ে ১৮/০৫/২০১৭ তারিখে জেলা প্রশাসক, রাজবাড়ী গংদের বিবাদী শ্রেণীভুক্ত করে বিজ্ঞ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে এল.এস.টি ৮৮/২০১৭ নং মোকদ্দমা দায়ের করে। যার ১নং বিবাদী সহকারী কমিশনার(ভূমি), ২নং বিবাদী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) ও ৩নং বিবাদী জেলা প্রশাসক। উক্ত মোকদ্দমায় বাবু মল্লিক আমমোক্তার নিযুক্ত হয়ে মোকদ্দমাটি পরিচালনা করছেন। আগামী ২৯/০৪/২০১৯ তারিখে এ মোকদ্দমায় বিবাদীদের সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য্য আছে।

অপরদিকে অধিগ্রহণকৃত সরকারী জমি মর্টগেজ দিয়ে ঋণ গ্রহণের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংক লিঃ রাজবাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক দেবাশীষ ঘোষ জানান, তিনি গত ১৮ই জানুয়ারী তারিখে রাজবাড়ী শাখায় যোগদান করেছেন। তার পূর্বের ব্যবস্থাপক বাবু মল্লিককে ঋণ দিয়েছেন। যেহেতু এ বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তাই খতিয়ে দেখা হবে। তবে বাবু মল্লিক ইতিমধ্যে ঋণ খেলাপী হওয়ায় তার কাছে ব্যাংকের পাওনা বিপুল টাকা আদায়ের জন্য তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ প্রায় ৩বছর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ খেলাপী ২০ লক্ষাধিক বকেয়া ঋণ আদায়ে কোন তৎপরতা দেখায় নি।

উল্লেখ্য, অনিয়মিত প্রকাশনা ও ঘোষণাপত্র অনুযায়ী নির্ধারিত ছাপাখানায় পত্রিকা মুদ্রণ না করা ও নির্ধারিত স্থান হতে প্রকাশ না করে ছাপাখানা ও প্রকাশনা(ঘোষণা ও নিবন্ধিকরণ) আইন, ১৯৭৩ এর ৯(৩)(খ) এবং ১০ ধারা লংঘন করায় গত ৩১শে মার্চ রাজবাড়ীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মোঃ শওকত আলী আবু রেজা আশরাফুল মাসুদ বাবু মল্লিক সম্পাদিত “সাপ্তাহিক অনুসন্ধান” পত্রিকার ঘোষণাপত্র(ডিক্লারেশন) বাতিল ঘোষণা করেন।

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর