,

বকুলকথা

News

একটা ছোট পরিবারের গল্প। পরিবারে রয়েছে মা- বাবা, দুই বোন ও সাথে তাদের দাদী। এই নিয়েই তাদের ছোট্ট সংসার। বড় মেয়েটার নাম বকুল আর ছোট মেয়ের নাম ডালিয়া। বকুলের বয়স যখন ৬ তখন প্রায় সে বুঝতে শিখে গেছে। বকুলের বাড়ি গ্রামে। বিকেল গড়ালেই সব ছেলেমেয়ের ভীড় জমায় কাজিদের পুকুরপারের মাঠে। একদিন বকুল খেলা শেষে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরল। তখন দেখে ওর মা খুব কাঁদছে। বকুল সারা ঘর এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পেল। মায়ের কান্না দেখে বকুলেরও ভীষণ কান্না পেয়ে গেলো। সেদিন তার বাবা বাড়িতে ফিরেছিল গভীর রাতে। প্রায় রাতে সে তার মায়ের আর্তনাদ শুনতে পেত । বকুল তখন ডালিয়াকে জড়িয়ে ধরত। ধীরে ধীরে বকুলের মায়ের অবস্থা করুণ হতে লাগলো। একদিন বকুল স্কুল থেকে এসে বরাবরের মত খুঁজতে শুরু করলো তার মাকে।কিন্তু মা কে সে কোথাও খুঁজে পেলো না। মায়ের পরনের শাড়িটা আলনার ওপর রাখা। ডালিয়াকেও সে দেখতে পেলো না। মা আর ডালিয়াকে না পেয়ে বকুলের সে যে কি কান্না। তাদের বাড়ির ভিতরের এক আত্মীয় তাকে বললো তার মা আর কখনো ফিরে আসবে না। তার মা এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।

এরপর থেকে বকুল অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতো যে একদিন তার মা ট্রেনে করে ঠিক বাড়ি চলে আসবে। তার মা ফিরে এসে তাকে অনেক আদর করবে। প্রায়ই সে ট্রেন দেখলে হাত নাড়ায়, এক ভাবে তাকিয়ে থাকে আর অপেক্ষা করে। কত দিন হয়ে গেল মাকে সে দেখে না এবং বাবার সাথেও তার তেমন কথা হয় না।দেখতে দেখতে বকুলের এখন আট বছর। তার দাদীর শরীর ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো। আট বছরের ওতটুকুন এক মেয়ের হাতে রান্না ঘরের দায়িত্ব পড়লো। রান্না ভালো না হলে তার বাবা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। প্রায় সময় তার স্কুল করা আর সম্ভব হত না। তার হাতে আর কলম না ; ঘর সামলানোর দায়িত্ব এসে গেছে। তিন-চার দিন হলো তার বাবা বাড়িতে আসেন না। এক রবিবারের সকাল, বকুল রান্না করছিল। হঠাৎ শোনে তার বাবার আওয়াজ। এক দৌড়ে ছুটে গিয়ে দেখে বাবা একা নন, লাল শাড়ি আর গহনা পড়া এক মহিলা। বুঝতে বাকি নেই বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে। তার এবার বুক ফেটে কান্না এলো তবুও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ের শাড়ি গুলো সরিয়ে নতুন বৌ তার জামা রাখছে, মায়ের গুছানো জিনিসে এবার নতুন মানুষটার অধিকার কিছুতেই মানতে পারছে না বকুল। তবুও শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা আজকাল বকুলের খোঁজ একেবারেই নেয় না। বাবা পেয়েছেন তার নতুন জীবনসঙ্গীকে, দাদী পেলেন বৌমাকে, ডালিয়া তো দিব্যি মাকে পেয়ে ভালোই আছে। তবে, বকুল কি শুধু অবহেলাই পেল? এসব ভাবতে ভাবতে চোখটা ভিজে এলো। তার বাবার নতুন সংসার সে আর মানতে পারে নি তবে সে কখনো এই বিষয় নিয়ে একটি কথাও বলে নি। দেখতে দেখতে ৩ টি বছর কেটে গেল। বাবা এবার আর তাকে পড়াবে না। মেয়েটিকে বিয়ে দিতে চান তবে বয়সে ছোট বলে সেটাও পারেন না। শেষমেশ তাকে গার্মেন্টসে দিয়ে দেয়া হলো। গার্মেন্টসে যাওয়ার পর তাকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। এইসময় কেউ পাশে ছিল না। সেই সময় তার চেয়ে ১৫ বছরের বড় এক ছেলের সাথে প্রণয় হয় পারিবারিক ভাবে তাদের বিয়েও হয়। বছর ঘুরতে না ঘুরতে বকুল মা হয়। এবার বকুলের পক্ষে কাজ করা বেশ কষ্টকর হয়। সংসারে কোন টাকা দিতে পারে না। স্বামীর হাতেও কোন টাকা তুলে দিতে পারে না। ধীরে ধীরে শুরু হয় বকুলের ওপর এক ধরনের পাশবিক অত্যাচার। বিয়ের ঠিক ৩ বছরের মাথায় বিয়েটা ভেঙে যায়। বকুলের আর কোন ছাদ নেই। ফিরে আসে বাবার বাড়িতে। সৎ মা বকুলকে এ বাড়িতে আর রাখতে চায় না। এদিকে, বাচ্চা ছোট থাকায় সে আর কোন কাজ করতে পারে না।রোজ কথা শুনতে হয় তাকে। এক শীতের সকালে বাচ্চাটার খুব ঠান্ডা লাগলো। সৎ মা, বাবা তেমন কোন গুরুত্ব দিলেন না। একটা সময় বাচ্চার করুণ অবস্থা দেখে তার সৎ মা নরম হলেন।বকুল আর বাচ্চাকে সাথে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে গেলেন। কিন্তু বকুলের বাবা এটাকে অপচয় বলে সৎ মাকে প্রচন্ড মারধর করলেন। ডাক্তার দেখানোর পরের দিন কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলো বাচ্চাটা। বকুল বাচ্চাটার হাসিমুখ দেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখে বাচ্চাটা তার কাছে নেই। সারা ঘর বাড়ি খুঁজলো কিন্তু পেল না। পরে জানতে পারলো, তার বাবা বাচ্চাটিকে বিক্রি করে দিয়েছে। সে যে কি কান্না বকুলের। নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে তার।

এভাবে চলতে লাগলো সাত মাস। তারপর একদিন তার বাবা এক নতুন বিয়ের প্রস্তাব আনে তার জন্য । তাকে বাধ্য করে বিয়ে করতে। লোকটি বকুলের চেয়ে প্রায় ২৭ বছরের বড়। লোকটার স্ত্রী মারা গেছে কিন্তু ৩ ছেলে আর ১ মেয়ে আছে। বিয়ের পর সেই বাড়িতে গিয়ে বকুল এক নতুন যন্ত্রণায় পড়লো।লোকটি প্রায় তাকে কোন কিছু ভুল হলেই মারধর করে। কোন সন্তান নিতে দেবে না আর। প্রতিটি ক্ষেত্রে সে যেন শিকলে বাঁধা। রাত হলেই সামান্য বিষয়েই প্রচন্ড মারধর আর অপমান বকুলকে বিষিয়েতুলছিল।একটা সময় সে তীব্র অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়। সে যে সিটে ভর্তি হয় তার পাশে আরেকজন রোগী। তিনি বেশ অসুস্থ। তার হাত ভেঙে গেছে। ভাসা ভাসা সুরে ভেসে আসছে কে যেন তাকে মেরে হাত ভেঙে দিয়েছে। পাশাপাশি দুটি সিট। প্রায় ৭ ঘন্টা পর তাদের একে অন্যের সাথে সামান্য চোখাচোখি হল। বকুল তাকাতেই জোরে চিৎকার দিয়ে বললো, ‘ও মা আমি বকুল! মা আমি তোমার বকুল মা। ‘ মা হাউমাউ করে কান্না করছে। তবুও কেউ কারোর কাছে যেতে পারছে না। তার ২ দিন পরে বকুলের মায়ের স্বামী বাড়ির লোক এসে তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় দুজন দু’জনার দিকে শুধু তাকিয়েছিল। এতদিন পরে দেখা হওয়ার পরেও স্পর্শ করার অধিকারটুকুও ছিল না। দুইজনের পায়ে এক অদৃশ্য শিকল বাঁধা ছিল।

এরপর বকুল বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে স্বামীর অত্যাচারের শিকার হয়ে। এবার চতুর্থ সময়। তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই যন্ত্রণা সে আর নিতে পারছে না। দম টা যেন বেরোলেই সে বাঁচে। বেশ কয়েকদিন শরীরের সাথে যুদ্ধ করে তার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু যেন তাকে পৃথিবীর সকল যন্ত্রণা থেকে স্বস্তি দিয়েছে। মাত্র ২ বছর তার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়েছিল। এরপর বকুলকে কেউ আর মনে রাখে নি।

এ কেবল একটি বকুলের গল্প নয়। এটি হাজারো বকুলের গল্প।

যেখানে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার জন্য অনেক মেয়ে হচ্ছে নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পত্রিকা খুললেই ধর্ষণের ঘটনা, যৌতুকের জন্য নারীকে পিটিয়ে হত্যার মত অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা হারহামেশায় দেখা যায়। এই চিত্র আজ বদলে দেওয়ার সময় এসেছে। নারীকে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। নারী এবং পুরুষকে এক হয়ে জীবন সংগ্রামে লড়তে হবে। সংসার জীবনে বা জীবনে চলার পথে পুরুষের প্রয়োজন নারীকে,নারীর প্রয়োজন পুরুষকে। কাউকে দমিয়ে বা অবমাননা করে কখনো উপরে উঠা সম্ভব নয়। এই সমাজ নারী ছাড়া পূর্ণতা পাবে না।সুতরাং নারী এবং পুরুষ দুজনেরই একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল, সহমর্মিতা এবং শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সে বিখ্যাত কবিতার লাইন মনে করে দেয় নারী পুরুষের সমান অধিকার কথাটি।

” বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।”

লেখিকা
কানিজ ফাতেমা

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর