অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন॥ঘোষিত ফলাফল প্রত্যাখান করে রাজবাড়ীতে সাংবাদিক সম্মেলন গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের পুনঃ নির্বাচন দাবী করেছে জেলা বিএনপি

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ ,২ এপ্রিল, ২০১৪ | আপডেট: ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ ,২ এপ্রিল, ২০১৪
পিকচার

বিশেষ প্রতিনিধি : গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের পুনঃ নির্বাচন দাবী করেছে রাজবাড়ী জেলা বিএনপি। গতকাল ১ এপ্রিল দুপুরে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে অনিয়ম ও ভোট ডাকাতির অভিযোগ জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল প্রত্যাখান করে পুনঃ নির্বাচন করেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা বিএনপির সভাপতি, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য ও রাজবাড়ী-১ আসনের সাবেক এমপি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের নির্বাচন স্বাধীনতা উত্তর কালের শ্রেষ্ঠ ভোট জালিয়াতি, ভোট ছিনতাই, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যর মাধ্যমে ভোটের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেয়ার যে কলঙ্কজনক নজির শাসকগোষ্ঠী স্থাপন করলো তা দেখে আমরা হতবাক হয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল এই নির্বাচনের মাধ্যমে গোয়ালন্দ উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৭৫হাজার ভোটারের মত প্রকাশের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে। জনগণ স্বাধীনতাভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করলাম শাসক দল তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে গণমানুষের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ভোট রিগিং-এ মেতে উঠলো। আওয়ামীলীগ তাদের তুচ্ছ দলীয় স্বার্থে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত রাজনৈতিক ঐতিহ্য ভেঙ্গে খানখান করে দিল। আওয়ামীলীগ যে ঘৃণ্য বিজয় লাভ করলো তা গণতন্ত্র হত্যার শামিল। শাসক গোষ্ঠী ভোটকেন্দ্রগুলোতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরী করে ভোটারদের ভোটদানে বাঁধা, বিএনপির পোলিং এজেন্টদের বুথে ঢুকতে না দেয়া ও ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোসহ নানা ধরনের অপকৌশলের আশ্রয় নেয়। এ অপকর্মের মধ্যদিয়ে আওয়ামীলীগ তাদের অতীত কদর্য চেহারাই গোয়ালন্দবাসীর কাছে উপস্থাপন করেছে। এতে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে,কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না।

আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম তার লিখিত বক্তব্যে আরো বলেন, ভোটের দিন সকাল থেকেই আমাদের কাছে অভিযোগ আসতে থাকে যে, আমাদের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না এবং যারা ঢুকেছিল তাদেরকেও বের করে দেয়া হয়েছে। আওয়ামীলীগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতাদের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক অস্ত্রধারী বহিরাগত ক্যাডাররা ঐ কাজটি করে বলে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ আছে। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী দীর্ঘ সময় গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়ায় অবস্থান করেন এবং তাদের আজ্ঞাবহ বিভিন্ন কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারদের যোগসাজশে প্রশাসনকে প্রভাবিত করে তাদের অনুগত লোকজনকে দিয়ে ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটের সঠিক ফলাফলকে পাল্টে দেয়া হয়। ক্ষমতাসীন দলের এমপির নেতৃত্বেই সেখানে জাল ভোটের মহোৎসব চলে। দেবগ্রাম ইউনিয়নের চর বেতকা রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেবগ্রাম কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেথুরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৮টা থেকেই অস্ত্রসস্ত্রসহ আওয়ামীলীগের ক্যাডাররা আমাদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয় এবং কেন্দ্রগুলো দখলে নেয়। এরপর তারা ব্যালট বই নিয়ে প্রকাশ্যে আনারস প্রতীকে সীল মারতে থাকে এবং শতশত ব্যালট সীল মেরে বাক্সে ঢুকায়। ছোট ভাকলা ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যালট বই নিয়ে সীল মেরে বাক্সে ঢুকাতে থাকে। পূর্ব তেনাপঁচা রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়েও তারা প্রচুর জাল ভোট প্রদান করেন। দৌলতদিয়া ইউনিয়নের চাঁনখাঁরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বড় সিংগা রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রও তারা সকাল ৮টা থেকে অস্ত্র উঁচিয়ে জোরপূর্বক দখল করে নেয়। এ ছাড়াও দৌলতদিয়া যদু মাতবর পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দৌলতদিয়া ঘাট রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর কর্নেশন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ দৌলতদিয়া শামজদ্দিন ব্যাপারী পাড়া কেন্দ্রগুলোতেও ভোট ডাকাতির মহোৎসব চলে। আর এ সকল কর্মকান্ডই হয় আওয়ামীলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের নাকের ডগায়। তাদের প্রত্যক্ষ মদদের কারনেই আমাদের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করে কোন প্রতিকার তো পায়ইনি বরং নানা ধরনের হয়রানীর শিকার হয়েছে। আমরা গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করছি। প্রহসনের এই নির্বাচন ও ভোট জালিয়াতি এবং আমাদের নেতাকর্মীদের নির্যাতন ও হয়রানীর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আওয়ামীলীগ আজকে যে কলঙ্কজনক কাজটি করে জনমতকে অসম্মান করলো তার পরিণতি কখনো ভাল হবে না। এই জঘন্যতম কাজের জন্য আওয়ামীলীগকেই বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে। অচিরেই জনতার রায়ে তাদের বিচার হবে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত যে রাজনৈতিক ঐতিহ্য আজ আওয়ামীলীগ ধ্বংস করলো তার দায়ভার পুরোপুরি তাদের। আমরা জনগনের অধিকার রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যাব। এই সংগ্রামে এই অঞ্চলের সকল শ্রেনী-পেশার মানুষ আমাদের সঙ্গে থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

সাংবাদিক সম্মেলনে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের বক্তব্যের পর আরো বক্তব্য রাখেন গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়া বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মোহাম্মদ আলী মিয়া। তিনি বলেন, ৩টি মোটর সাইকেলযোগে সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা দৌলতদিয়া ৭নং ওয়ার্ডের কেন্দ্রে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে জাল ভোট দেয়। এরপর তারা পর্যায়ক্রমে একইভাবে উজানচর ৮নং, চর কর্নেশন ও পূর্ব বেথুরিসহ অন্ততঃ ১৬টি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে জাল ভোট দেয়ার মহোৎসব করে। আমি নিজে ব্যাপারটি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বলার পরও তারা কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। এ ছাড়াও ভোটের পর কেন্দ্রে গণনা না করে সবকিছু উপজেলা হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ভাবেই আমাদের নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়।

মোহাম্মদ আলী মিয়া অভিযোগ করে আরো বলেন, ভোটের ২দিন আগে এমপি সাহেব ভোট গ্রহনের সাথে সংশিৱষ্ট কর্মকর্তাদের রাজবাড়ীতে ডেকে নিয়ে ‘যে ভাবেই হোক আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করার’ নির্দেশ দেন-যা ঐ সভায় উপস্থিত থাকা আমাদের ঘনিষ্ঠরা জানান। তার বক্তব্যের পর আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এবং মোহাম্মদ আলী মিয়াসহ জেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, তারা জোর পূর্বক জাল ভোট দিলেও আমরা জনরায়ের প্রতি বিশ্বাসী ছিলাম বলে তাৎক্ষণিকভাবে ভোট বর্জনের ঘোষণা না দিয়ে শেষ দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। এখন দলীয়ভাবে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশন কিংবা উচ্চ আদালতে যাব।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে জেলা বিএনপির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, রাজবাড়ীতে খালেক সাহেব শক্ত প্রার্থী থাকায় এবং দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে তার পক্ষে কাজ করায় আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলাম।

জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য ও রাজবাড়ী-২ আসনের সাবেক এমপি নাসিরুল হক সাবু, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান এডঃ এম.এ খালেক, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি রোকন উদ্দিন চৌধুরী, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এডঃ আসাদুজ্জামান লাল ও সহ-সভাপতি মোঃ আলতাফ হোসেন মুরাদ, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের অন্যতম সদস্য, জেলা মহিলা দলের আহবায়ক ও সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহীনূর আক্তার বিউটি, জেলা যুগ্ম-সম্পাদক গাজী আহসান হাবীব, বিএনপির দপ্তর সম্পাদক এ মজিদ বিশ্বাস, সহ-দপ্তর সম্পাদক কে.এম এহসান শাহীন, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কে.এ সবুর শাহীন, জেলা যুবদল নেতা আব্দুল খালেক এবং জেলা ছাত্রদল নেতা আব্দুল মালেকসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী এ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

উলেৱখ্য, গত ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোঃ নুরুল ইসলাম(আনারস) নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আনারস প্রতীকে পেয়েছেন ২০হাজার ৯৬২ ভোট। তার নিকটতম স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মোঃ নজরুল ইসলাম(ঘোড়া প্রতীক) পেয়েছেন ১৫ হাজার ৬৪৬ ভোট। অপর প্রার্থী বিএনপির মোহাম্মদ আলী(দোয়াত কলম) ১২হাজার ৪৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। তবে সংরৰিত মহিলা আসনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোছাঃ নার্গিস পারভীন(ফুটবল) ২৩হাজার ৫২০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগ প্রার্থী নুরজাহান বেগম(পদ্মফুল) ৯হাজার ৯৭৫ ভোট পেয়েছেন।

 


এই নিউজটি 1868 বার পড়া হয়েছে
[fbcomments"]