রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সম্প্রচার নীতিমালা

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৬:৪৩ অপরাহ্ণ ,৭ আগস্ট, ২০১৪ | আপডেট: ৮:০৬ অপরাহ্ণ ,৭ আগস্ট, ২০১৪
পিকচার

ঢাকা : জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তাদের মতে দেশে প্রকৃতপক্ষে কোন বিরোধী দল না থাকায় সরকার বর্তমানে গণমাধ্যমকে বিরোধী দল হিসেবে বেছে নিয়েছে। গণতন্ত্রকে হত্যার জন্য সর্বশেষ হাতিয়ার হিসেবে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। আর এ জন্য সমপ্রচার নীতিমালার নামে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হচ্ছে। গতকাল নাগরিক ঐক্য আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘নিয়ন্ত্রণমূলক সমপ্রচার নীতিমালা জনগণ মানবে না’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। বৈঠকে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত নীতিমালা সম্পর্কিত খবর থেকে সবার কাছেই পরিষ্কার, টিভি চ্যানেলের টকশো নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি মনে করছে সরকার। দু’-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এসব অনুষ্ঠানে ‘বিভ্রান্তিমূলক ও অসত্য তথ্য’ দেয়ার প্রমাণ এখন পর্যন্ত কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। সরকারের ও শাসক দলের সমালোচনা ও দোষত্রুটি তুলে ধরার পাশাপাশি পরিস্থিতির বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণের ফলে টক-শোগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের। সংবাদ প্রচারে ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায়। তারপরও মিডিয়ার বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী ভূমিকার কারণে সরকার বিরোধী জনমত শক্তিশালী হওয়ায় মিডিয়ার ভূমিকা খর্ব করার জন্যই এখন সম্প্রচার কমিশন গঠনের অপেক্ষা না করেই এ সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে দেরি করা হয়নি। লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, বিষয়টি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে কারণ বর্তমান সরকার যেভাবে গঠিত হয়েছে সেটাই বিতর্কিত। এ সরকারকে কোনভাবেই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বলা যায় না। বর্তমানে বিরোধীদল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় গ্রহণযোগ্য সমপ্রচার কমিশন গঠনের আগেই তড়িঘড়ি নীতিমালা প্রণয়ন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারির ঘোষণা নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যেই গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি না করে পারে না। মান্না বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে সরকার অদ্ভুত ও উদ্ভট কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাদের মধ্যে সত্যের কোন বালাই নাই। সমপ্রচার নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে সরকার যেভাবে চাইবে সেভাবেই কথা বলতে হবে। অস্থিতিশীলতার মধ্যেও সরকার বলছে দেশ শান্ত রয়েছে। আমাদেরও তাই বলতে হবে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে ৫ ভাগও ভোট পড়েনি সেটি টেলিভিশনে বলা যাবে না। তিনি বলেন, আমরা কথা বলবোই। কথা বন্ধ করা যাবে না।
বৈঠকে সাবেক তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, নীতিমালা করে কখনও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা যায়নি, যাবেও না। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ নীতিমালা টিকবে না। পৃথিবীর কোন দেশে এরকম নজির নেই। তিনি আরও বলেন, জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালার নামে যা হচ্ছে তা পাগলামি ছাড়া কিছু না। এগুলো প্রাচীন যুগের চিন্তা-ভাবনা। এ নীতিমালা দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির এই যুগে নীতিমালা করে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সমাজে নিরপেক্ষ লোকের অভাব থাকায় স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠন সম্ভব নয়।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য র্যাবকে ব্যবহার করছে। তারা এখন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। যে সরকারের জনসমর্থন নেই তাকে সংবাদ মাধ্যমের ওপর চড়াও হতে হবে এটাই স্বাভাবিক। ৫ই জানুয়ারির মত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে তাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য এ পর্যায়ে আসতেই হবে। স্বৈরাচারী সরকারের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তারা সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। গণতন্ত্রের স্বার্থে এ নীতিমালাকে বর্জন করা দরকার। প্রথমে তারা জনগণকে গুলতি মারছে তার পর কামান মারবে। নীতিমালা তৈরি করে দেখবে কি প্রতিক্রিয়া হয়। একসময় তারা গণমাধ্যম বন্ধ করে দেবে। এ নীতিমালার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমগুলো সোচ্চার না হলে আগামী বছরের শুরুর দিকে অনেক গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে যাবে এমন আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নের আগেই সরকার টকশোকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে অনেক আলোচককে টকশো থেকে দূরে রাখা হয়েছে। সম্প্রচার নীতিমালার মাধ্যমে সরকার গণমাধ্যমের ওপর ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করছে। সরকারের মন্ত্রীরাই সবচেয়ে বেশি অসত্য তথ্য প্রদান করে দাবি করে তিনি বলেন, বিটিভির মাধ্যমে সরকার অনেক অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছেন। সম্প্রচার নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে বিটিভির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে? সম্প্রচার নীতিমালার ত্রুটি তুলে ধরে তিনি বলেন, এই নীতিমালা অনুসারে সরকার নিজেই অভিযোগ দায়ের করবে। আবার সরকার নিজেই শাস্তি দেবে। এখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা হয়নি। নীতিমালায় বন্ধু রাষ্ট্র শব্দের মাধ্যমে একটি বিশেষ রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়েছে। এতে করে ওই রাষ্ট্রের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকবে না। আওয়ামী লীগ সরকারই সবচেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা করেছে দাবি করে তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রেস্টে জালিয়াতি করেছে এই সরকার। অথচ সম্প্রচার নীতিমালায় তারা উল্লেখ করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কিছু প্রচার করা যাবে না।
কলামনিস্ট মুহম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, সমপ্রচার নীতিমালা সম্পূর্ণ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা এসেছে গণমাধ্যমের মোড়কে। ভাগ্যিস ৭৫ সালে ২৫টা টিভি চ্যানেল ছিল না। তাহলে বেশি পরিমাণে সাংবাদিক চাকরি হারাতেন। তিনি আরও বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারের মধ্যে অলিখিত অস্বস্তি বিরাজ করছে। সরকার বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হজম করেছে। বর্তমান সরকারকে বেশি বেকায়দায় রেখেছে গণমাধ্যম। এজন্য কিছু জনপ্রিয় গণমাধ্যমকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ঢুকতে দেয়া হচেছ না। কিছু পত্রিকার ওপর ক্রোধ কাজ করছে। কিছু আলোচককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিটিভির খবর প্রচার করতে বাধ্য করছে। আবার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলো জনপ্রিয়তা হারাবে।
তিনি বলেন, টকশো অনুষ্ঠানের প্রতি সরকার ক্ষুব্ধ। কারণ মানুষ এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাত জেগে সরকারের সমালোচনা শোনে। সমপ্রচার নীতিমালায় বিভ্রান্তিকর তথ্যের কথা বলা হয়েছে। অথচ এই তথ্য কে যাচাই করবে সে সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। ভুল তথ্য দেয়ার অধিকার কারও নেই। পত্রিকাগুলোতে ভুল তথ্য উপস্থাপন করার সুযোগ রয়েছে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে এমন সুযোগ রাখা যেতে পারে। বর্তমান সরকার নার্ভাস অবস্থায় রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার জাতীয় পার্টিকে সফলভাবে নিঃশেষ করেছে। বিএনপিকে কাবু করেছে যেন তারা আন্দোলন করতে না পারে। এখন তারা কিছু লোককে টেলিভিশনের পর্দা থেকে সরিয়ে দিতে চায়।
সিনিয়র সাংবাদিক আশরাফ কায়সার বলেন, নীতিমালা দিয়ে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার সরকার কেড়ে নিতে পারবে না। এই সরকার ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না। তারা পছন্দের লোকদের মিডিয়ার লাইসেন্স দিয়েও ভরসা পাচ্ছে না। সম্প্রচার নীতিমালা করে তাই তার গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করতে চাইছে। আওয়ামী লীগ এর আগেও এ কাজ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করেছে। বেসরকারি চ্যানেলগুলোকে বিটিভি বানানোর চেষ্টা করছে। পরীক্ষায় নকল করে পাস করা শিক্ষার্থীরা যেমন অস্বস্তিতে থাকে তেমনি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এ সরকার অস্বস্তিতে আছে। বর্তমান সরকারের নৈতিক অবস্থা খুবই দুর্বল। তারা নীতিমালার মাধ্যমে গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দিতে চাইছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশের সরকারি গণমাধ্যমের খবর কেউ বিশ্বাস করে না। কারণ তারা নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে না। বিরোধী দলের সংবাদ তারা প্রচার করে না। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি গণমাধ্যমগুলোকে সরকারি গণমাধ্যমের পরিণতি বরণ করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের জবাবদিহির জায়গা হচ্ছে সংসদ ও গণমাধ্যম। কিন্তু সরকার উল্টো গণমাধ্যমকে চোখে চোখে রাখছে। নীতিমালার মাধ্যমে গণমাধ্যমের হাত-পা বাঁধতে চাইছে। সমপ্রচার কমিশন গঠনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ কমিশন গঠন হবে স্তাবক দিয়ে। তিনি আরও বলেন, টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স নিয়ে ভয়ঙ্কর জোচ্চুরি হচ্ছে। এর একটা মানদণ্ড থাকা দরকার। সরকারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে তা নিজস্ব গণমাধ্যমের মাধ্যমে খণ্ডন করুক। অন্যের চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খুন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে।
মানাবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সভাপতি সি আর আবরার বলেন, বর্তমান সরকার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সরকারের এ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কোন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আমরা বড় ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জনগণের অধিকার হরণকারী আইন পূর্ববর্তী সরকার তৈরি করেন আর পরবর্তী সরকার অতি উৎসাহে তা লালন পালন করে থাকে। সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, টক শো নিয়ন্ত্রণ শুরু ২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের সময় থেকে। ল রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি সালেহ উদ্দিন বলেন, এ সরকারে কোন লজ্জা নেই। তারা যেনতেন নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসেছে। সরকার যে ভাবে চেয়েছিল সেভাবেই নীতিমালা করেছে। কারও অভিমত গ্রহণ করেনি।

 

 

আপডেট : বৃহস্পতিবার ৮ আগষ্ট,২০১৪/ ১২:৪৪ এএম/ আশিক


এই নিউজটি 1235 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments