রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউপির খোলাবাড়িয়া গ্রামে স্টোকে মৃত্যুর ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানী !

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৬:৩২ অপরাহ্ণ ,৩ এপ্রিল, ২০১৪ | আপডেট: ৬:৩২ অপরাহ্ণ ,৩ এপ্রিল, ২০১৪
পিকচার

॥স্টাফ রিপোর্টার॥ রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামের একটি স্টোকে মৃত্যুর ঘটনায় পূর্ব বিরোধের জেরে থানায় মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করার অভিযোগ উঠেছে নিহতের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, খোলাবাড়িয়া গ্রামের মৃত ইয়াজদ্দিন শেখের ছেলে আরশাদ আলী শেখ (৫৫) কয়েক বছর পূর্বে একই গ্রামের মৃত ইব্রাহীম মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন (৪৮) এর সাথে ৫০ শতাংশ জমি এ্যাওয়াজ বদল করে নেয়। আনোয়ার হোসেন বদলে নেয়া জমিতে পুকুর খনন ও পাড়-ভিটা বাঁধিয়ে গাছপালা রোপন করে এবং আরশাদ আলী চারপাশে মেহগনির চারা রোপন করে মাঝের অংশে চাষাবাদের মাধ্যমে ভোগদখল করে আসছিল। কয়েক মাস পূর্বে হঠাৎ আরশাদ আলী পূর্বের এ্যাওয়াজ বদল অস্বীকার করে আনোয়ার হোসেনের কাছে জমি ফেরত চায়। কিন্তু আনোয়ার হোসেন তাতে অসৃকীতি জানায়। এ নিয়ে আরশাদ আলী ঝামেলা করা শুরু করলে আনোয়ার হোসেন স্থানীয় পাঁচুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ করেন। পাঁচুরিয়া ইউপির চেয়ারম্যান কাজী আলমগীর হোসেন সালিশের জন্য আরশাদ আলীকে নোটিশ দিলেও সে তাতে সাড়া না দিয়ে অন্যায়ভাবে এ্যাওয়াজ বদলকৃত জমি ফেরতের দাবীতে অনড় থাকে। পরবর্তীতে আরশাদ আলী জোর করে আনোয়ার হোসেনের দখলে থাকা জমিতে ঘর উত্তোলনের পাঁয়তারা করা শুরু করলে আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌঃকাঃবিঃ আইনের ১৪৪ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা করা স্বত্বেও আরশাদ আলী ও তারা ছেলেরা আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সেই জমিতে জোর করে একটি টিনের ঘর উত্তোলন করে। নিরূপায় হয়ে আনোয়ার হোসেন ফের স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের দ্বারস্থ হলে চেয়ারম্যান আবারও সালিশে উপস্থিত হওয়ার জন্য আরশাদ আলীকে নোটিশ দেয় কিন্তু আরশাদ তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের অন্যায্য দাবীতেই অনড় থাকলেও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। গত ৫ ডিসেম্বর (২০১৩ ইং) রাত ১১টার দিকে আরশাদ আলীর ছেলেরা একই গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে আবুল শেখ (৩৫)কে আটক করে চোর সাব্যস্ত করে শোরগোল ও মারধর করতে থাকে। ওই সময় আশপাশের লোকজন আরশাদ আলীর বাড়ীতে এসে উপস্থিত হয়। সেই গন্ডগোল চলার একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে ছেলেদের সাথে কথা বলার একপর্যায়ে আরশাদ আলী হঠাৎ স্টোক করে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে তার মাথায় পানি দেয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ফারুককে এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে পথেই তার মৃত্যু হয়।

আরশাদ আলী অসুস্থ্য হয়ে পড়ার পর থেকে মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত তার ছেলেরা কিংবা পরিবারের অন্য কোন সদস্য মৃত্যুর পূর্বে তাকে কেউ মারধর করেছে বলে কারো কাছে কোন অভিযোগ না করে চোর বলে আটককৃত আবুল শেখকে খানখানাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে সোপর্দ করে এবং তার বিরুদ্ধে চুরির চেষ্টা করার অভিযোগও করে। পরবর্তীতে স্থানীয় কুচক্রী মহলের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে পরদিন হঠাৎ করেই আরশাদের ছেলেরা দাবী করা শুরু করে মারধরের ফলে তার পিতার মৃত্যু হয়েছে। আনোয়ার হোসেন ও তার বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য জাকির হোসেন (৬০), ধৃত আবুল শেখ, একই গ্রামের মোজা শেখ (৫৫), হাবিব শেখ (৪০) ও ইসহাক (৩৫)সহ আরো কয়েকজন জোর করে ঘরে ঢুকে আরশাদ আলীকে মারধর করার কারণেই তার মৃত্যু হয়। ওই দিনই (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে নিহত আরশাদ আলীর ছেলে ইসহাক (২৫) বাদী হয়ে আনোয়ার হোসেন, জাকির হোসেন, আবুল শেখ, মোজা শেখ, হাবিব শেখ ও ইসহাকের নাম উল্লেখ করাসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জনকে আসামী করে রাজবাড়ী থানায় হত্যা মামলা নং-০৯, তাং-০৬/১২/২০১৩ ইং, ধারা-১৪৩/৪৪৮/৪২৭/৩০২/৩৪ দঃবিঃ দায়ের করে। তার আগে তারা খানখানাপুর তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশের কাছে আবুলকে সোপর্দ করার সময় দেয়া চুরির অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়।

মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর আনোয়ার হোসেনসহ এজাহারনামীয় অন্যান্য আসামীরা (ধৃত আবুল বাদে) মহামান্য হাইকোর্ট থেকে এবং পরবর্তীতে রাজবাড়ীর বিচারিক আদালত থেকে জামিন লাভ করে।

প্রথমে খানখানাপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এস.আই তাজ উদ্দিন মামলাটির তদন্ত করেন। পরে মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলে রাজবাড়ী ডিবির ওসি মিজানুর রহমান মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন। গতকাল ২ এপ্রিল দুপুরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান নিহত আরশাদ আলীর ২ সহোদর মাজেদ শেখ (৬০) ও তোরাপ আলী (৫০), খোলাবাড়িয়া গ্রামের আব্দুল আলী (৬৫), পল্লী চিকিৎসক ফারুক (২৫) এবং বিশ্বনাথ সাহা (৪৫)’র জবানবন্দী গ্রহণ করেন।

জবানবন্দী দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় আব্দুল আলী, বিশ্বানাথ সাহা ও পল্লী চিকিৎসক ফারুক রাজবাড়ী নিউজ”কে বলেন, ঘটনার রাতে তারা শুনেছিলেন চোর ধরার ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে পড়ার একপর্যায়ে আরশাদ আলী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ওই রাতে তারা আরশাদ আলীকে মারধর করার কোন কথা শোনেননি।

নিহত আরশেদ আলীর ২ সহোদর মাজেদ শেখ ও তোরাপ আলী শেখও পুলিশের কাছে তাদের দেয়া জবানবন্দীতে আরশাদ নিহত হওয়ার পূর্বে তাকে মারধর করার কথা শোনেননি বলে উল্লেখ করেননি বলে জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিবির ওসি মিজানুর রহমান তদন্তের স্বার্থে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু বলতে অসৃকীতি জানান।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে নিহত আরশাদ আলীর ময়না তদন্তকারী ডাক্তার আদালতে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন, যাতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে হেড ইনজুরী উল্লেখ করা হলেও স্পষ্ঠভাবে আঘাতটি মাথার কোথায় কিভাবে হয় সে সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেননি। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই ধরণের ইনজুরী স্টোক করলে হতে পারে। তবে, মামলার আসামী হয়ে আনোয়ার হোসেনরা পলাতক থাকার সুযোগে ওই প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে মোশতাক মেম্বার গং অবৈধভাবে প্রভাব খাটাতে পারে বলে অনেকেই আশংকা করেছেন।

আরশাদ হত্যা মামলার ১ নং আসামী (বর্তমানে জামিনে থাকা) মোঃ আনোয়ার হোসেন “রাজবাড়ী নিউজ” কে  বলেন, পাঁচুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার মোশতাক (নিহত আরশেদের ভাগ্নে) খোলাবাড়িয়ার গ্রামের সুব্রত নামের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের এক ব্যক্তির কাছ থেকে তার ২৩ শতাংশ জমি ১ লাখ টাকা দিয়ে কিনতে চেয়েছিল। সেই জমিটি সে (আনোয়ার) ৩ লাখ টাকা দিয়ে কিনে নেয়ায় মোশতাক মেম্বার ক্ষুদ্ধ হয় এবং আরশেদ মারা যাওয়ার পর সেই ক্ষোভের বশে তার মামাতো ভাইদেরকে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাটি করায়। তিনি আরশাদ নিহত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবী করেন।

 


এই নিউজটি 1545 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments