ভুল চিকিৎসায় লিলির অকাল মৃত্যুর দাম মাত্র ১লক্ষ টাকা : রক্ষা পেল দুই ডাক্তারসহ রাবেয়া ক্লিনিকের মালিক

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৩:১৩ পূর্বাহ্ণ ,১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ | আপডেট: ৩:১৩ পূর্বাহ্ণ ,১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
পিকচার

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজবাড়ী শহরের রাবেয়া প্রাইভেট হাসপাতালে গত ১২ই সেপ্টেম্বর রাতে সিজারিয়ান অপারেশনকালে চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসায় প্রসুতি লিলি খাতুনের অকাল মৃত্যুর ঘটনায় মামলা ও আইনী ঝামেলা থেকে রক্ষা পেতে মৃতার পরিবারকে ১লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে রক্ষা পেয়েছে দুই ডাক্তারসহ ক্লিনিক মালিক। এ ছাড়াও স্থানীয় মাস্তান ও দালাল চক্র নিয়েছে আরো ৫০ হাজার টাকা। ভোর রাতে টাকা দিয়ে এ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়।

মৃত লিলির স্বজনদের অভিযোগ, শহরের পাবলিক হেলথ সজ্জনকান্দা এলাকার রাবেয়া প্রাইভেট হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনকালে ভুল চিকিৎসায় লিপির মৃত্যুর পর ক্লিনিকের ওটি(অপারেশন থিয়েটার) থেকে সিজারের সাথে সম্পৃক্ত সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ রহিম বক্স এবং মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের গাইনী কনসালট্যান্ট ডাঃ শামসুন নাহার বেবী তার ‘মৃত্যুর কথা চেপে গিয়ে’ জীবিত থাকা ছেলে বাচ্চাটিকে রোগীর স্বজনদের হাতে তুলে দিয়ে প্রকাশ করেন, ‘প্রসুতী কিছুটা অসুস্থ্য রয়েছে। কিছুক্ষণ পরে তাকে ওটি থেকে বের করা হবে।’ তাদের কথামতো লিলির স্বজনরা অপেক্ষা করা শুরু করেন। রাত ১০টার দিকে ডাঃ রহিম বক্স এবং ডাঃ বেবী নিহতের স্বজনদের জানান, রক্তের প্রয়োজন। কিছুক্ষনের মধ্যেই নিহতের এক ভাই রক্ত দিতে গেলে রক্ত নেয়ার পরিবর্তে প্রকাশ করেন, ‘রোগীর অবস্থা খারাপ, তাকে ফরিদপুরে নিতে হবে।’ ঐ সময় ডাঃ রহিম বক্স ‘মৃত লিলিকে জীবিত দেখানোর জন্য রোগীর শ্বাসনালীর মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা অক্সিজেনের নলের মাথার বেলুন জাতীয় জিনিসে অনবরত পাঞ্চ করতে থাকেন, ফলে মৃতের পেট কিছুটা উঁচুনিচু হতে থাকে।’ কিন্তু নিহতের স্বজনরা এই চাতুরী তখনই ধরে ফেলে সে আর জীবিত নেই বলে প্রকাশ করে। তা সত্ত্বেও ডাঃ রহিম বক্স তখনও পাঞ্চ করতে করতে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে, সে জীবিত আছে, ফরিদপুরে নিতে হবে।’ কিন্তু নিহতের স্বজনরা মৃত মানুষকে এভাবে জীবিত দেখানোকে প্রত্যাখ্যান করে তাকে ফরিদপুরে বা অন্য কোথাও নিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন ক্লিনিকের মালিক ও ম্যানেজারসহ দায়িত্বশীলরা ভেগে গিয়ে স্থানীয় মাস্তান ও দালাল শ্রেণীর লোকজনকে ক্লিনিকে পাঠিয়ে জোরপূর্বক ঐ মৃতা লিলিকে একটি এ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেয়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু নানা ধরনের চাপ এবং ভয়-ভীতির মধ্যেও নিহতের স্বজনরা অনড় থাকায় তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। রাত ১২টার দিকে সদর থানার একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর ডাক্তারদ্বয় নিহতের স্বজনদের মতো তাদেরকেও একইভাবে অক্সিজেনের নলে পাঞ্চ করে করে জীবিত থাকার কথা বলে স্বজনদের সাথে সমঝোতার ব্যবস্থা করে দেয়ার অনুরোধ জানান। একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিততেই বিভিন্ন ক্লিনিকের কয়েকজন দালাল স্থানীয় মাস্তান ও দালাল শ্রেণীর লোকজনের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে ওটি থেকে নিহত প্রসুতীকে স্ট্রেচারে তুলে ক্লিনিকের লোকজনের ভাড়া করা এ্যাম্বুলেন্সে জোর করে তুলে দেয়ার চেষ্টা করে। ঐ সময় নিহতের স্বজনদের উপর বহিরাগত দালাল-মাস্তানরা জবরদস্তি করতে থাকে। নিহতের স্বজনরা মৃত মানুষকে এভাবে জীবিত দেখানোর ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশের কাছে অনুনয় করে প্রকাশ করে, এত নাটকের কি প্রয়োজন। মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে দিলেই তো তারা লাশ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। তা না করে অন্য কারো ঠিক করা এ্যাম্বুলেন্সে করে তারা মৃতদেহটিকে কোথায় নেবেন! একপর্যায়ে ডাঃ রহিম বক্স এবং ডাঃ বেবী আবারও মৃতাকে ‘জীবিত কি না পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ করলে সে যে জীবিত নেই প্রকাশ না করে মাথা নীচু করে সেখান থেকে চলে যান।

রাত পৌনে ১টার দিকে সদর থানার ওসি মোঃ শহিদুল ইসলাম আরো একদল পুলিশ নিয়ে সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে(ক্লিনিক মালিক ও মৃতার আত্মীয় স্বজন) সমঝোতার প্রচেষ্টা। ক্লিনিকের পক্ষে যারা সমঝোতার চেষ্টা করতে থাকে তারা ঐ ক্লিনিকের কেউ না! মৃতা লিলি খাতুন রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর পশ্চিমপাড়ার শামীম শেখের স্ত্রী। তাদের ৪বছর বয়সী আরেকটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
মৃত লিলির শ্বশুর ছাত্তার শেখ জানান, অন্তঃস্বত্ত্বা হওয়ার পর থেকে তার পুত্রবধু লিলি ডাঃ শামসুন নাহার বেবীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। নিয়মিতভাবে লিলিকে তার পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সবকিছু করানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে লিলিকে ডাঃ বেবীর পরামর্শে সরকারী হাসপাতালের পরিবর্তে সেখানে(রাবেয়া ক্লিনিকে) ভর্তি করা হয়। সবকিছু ঠিকঠাক আছে বলে উল্লেখ করে কয়েক ঘন্টা পরই তাকে সিজারের জন্য ওটিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ছাত্তার শেখ আরো বলেন, সিজার করার সময় ডাক্তারদের ভুলের কারণেই লিলি মারা যায়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যদি তাই না হবে তাহলে কেন তার মৃত্যু নিয়ে এ ধরনের অমানবিক লুকোচুরি করা হলো!

সর্বশেষ ওইদিন রাত ৪টার দিকে ক্লিনিকের মালিক লিটনের স্ত্রী ঘটনাস্থলে এসে মাস্তান, দালালদের মাধ্যমে নিহতের স্বজনদের ১ লাখ টাকা (নগদ ৫০ হাজার এবং ৫০ হাজার টাকার ১টি চেক) দেয়ার পর তারা মামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাশ নিয়ে চলে যায়। মৃতা লিলির স্বজনরা লাশ নিয়ে চলে যাওয়ার পর ক্লিনিকের মালিকের পক্ষে তার স্ত্রী দালাল-মাস্তানদের দাবী মিটিয়ে(৫০হাজার টাকা দিয়ে) ক্লিনিক ত্যাগ করেন। ১লাখ টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করে নিহত লিলি খাতুনের স্বামী সদর উপজেলার রামকান্তপুর পশ্চিমপাড়ার শামীম শেখ জানান, তারা ১লাখ টাকা পেয়েছেন। মাস্তানদের চাপের মুখে তাদেরকে এই টাকা নিতে বাধ্য করা হয়েছেন।

 

 

আপডেট : রবিবার সেপ্টেম্বর ১৪,২০১৪/ ০৯:১৩ এএম/ আশিক

 


এই নিউজটি 1595 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments