,

তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে

ডাঃ জোবায়দা রহমান
ডাঃ জোবায়দা রহমান

রাজবাড়ি নিউজ২৪.কম :: 
মাহবুবা নাজরীনা জেবিন

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে চোখবুলানো আমার অনেক দিনের অভ্যাস। প্রায় অর্ধযুগেরও বেশী সময় দেশের বাইরে থাকলেও এর ব্যতিক্রম খুব একটা ঘটেনি। অনলাইন পত্রিকা পড়ে দেশবিদেশের সবখবর জানা হয়ে যায়। যদিও এখন সংবাদপত্র আর টেলিভিশনে নেতিবাচক সংবাদের পরিমানটাই বেশী। তবু অপেক্ষা করি যেকোন পজিটিভ নিউজের জন্য। গত কয়েকদিন আগের একটি খবর আমাকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। পরিধি ছোট্ট এক কলামের হলেও খবরটি যেকোন সচেতন মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে কারণে অকারণে অনেক সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকুরীচ্যুত হন। কিন্তু একজন মেডিকেল অফিসারকে তার চাকুরী থেকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়ে, একজন মন্ত্রী র্কতৃক সংসদে ঘোষণা দেবার ঘটনা নজির বিহীন। শুধু তাই নয় সরকারী দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে চাকুরীচূত্যির এ ঘোষণায় উল্লাস প্রকাশ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন দেশের পার্লামেন্টে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কিনা আমার জানা নেই। মেডিকেল অফিসার এমন কোন বড় প্রাতিষ্ঠানিক পদ নয় যে -স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে এই চাকুরীচুত্যির খবর সংসদের মাধ্যমে জানিয়ে জাতিকে ধন্য করতে হবে। তিনি সংসদে এ বিষয়টি নিয়ে তামাশা করে দেশের একজন নাগরিকের সম্মানহানীর মাধ্যমে তার মানবাধিকার লংঘন করেছেন। সেই সাথে নারী হিসেবে তার সম্মানের প্রতি চরম অবমাননা করে, মাননীয় সাংসদরা কি বিনোদন পেলেন সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।

হায়রে অভাগা দেশ রতন চিনলি না। আমাদের দেশের সম্মানিত ব্যাক্তিদের অসম্মান করা বর্তমানে একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা কিনা একটি জাতির জন্য কলঙ্কজনক। ডাঃ জোবায়দা রহমান মেধা-মননে সবসময় উজ্জ্বল। দেশে এবং বিদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে তার সাফল্য যে কারোর জন্য আরাধ্য। তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষায় ডিস্টিংশানসহ ৫৩ টি দেশের শিক্ষার্থীদের পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছেন। তার এই সাফল্যের দ্বারা তিনি বাংলাদেশের মুখ উজ্বল করেছেন। বিদেশের লোভনীয় চাকুরীর প্রস্তাব গ্রহন করেননি। ফিরে যেতে চেয়েছিলেন মাতৃভুমিতে । লক্ষ্য ছিলো শুধুমাত্র দেশের মানুষের সেবা করা। কিন্তু হায় আমরা যে ঘরের লক্ষীকে পায়ে ঠেলছি।

বলা হচ্ছে যে ডাঃ জোবায়দা রহমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে তার ছুটি বাড়ানো হয়নি এবং কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকার কারনে তাকে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু কথা থেকে যায়………

ডাঃ জোবায়দা রহমান ২০০৮ সালে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় থেকে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে ছুটি নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয়ের স্বারক পার-৫/ছুটি-১৭/শিক্ষা/২০০৮/১১২৮, তারিখঃ ০৩.১১.২০০৮। সেই সময় এটি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এ সময় তিনি চাকুরীর পাশাপাশি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এমডি (কার্ডিওলজি) কোর্সের ৩য় পর্বে পড়ছিলেন। নির্ধারিত ছুটি শেষ হবার আগেই সরকারী চাকুরীর নিয়ম মেনে তিনি ছুটির আবেদন করলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয় পুনরায় তিন মাসের ছুটি মঞ্জুর করে। এরপর স্বামী পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায়, যথাযথ সরকারী নিয়ম মেনে দায়িত্বশীল স্ত্রী হিসেবে ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। তিনি মানবিক দিক বিবেচনায় এ আবেদনে করলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয়ের কোন সাড়া পাননি।

এরপর তিনি আরো কয়েক দফা ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করলেও অদৃশ্য হাতের ইশারায় মন্ত্রনালয় নিশ্চুপ থাকে। ডাঃ জোবায়দা রহমানের ছুটিযে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় মঞ্জুর করেনি ,সেই খবরটি ও তাকে জানানো হয়নি। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোন অর্থ না নিয়ে অর্থাৎ বিনা বেতনে বিদেশে ছুটিতে থাকাকালীন সময়ে, অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে তার বিরুদ্ধে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকেও তাকে করা হয়েছে বঞ্চিত।

জোবায়দা রহমানের বর্তমান ঠিকানা মন্ত্রনালয়ের জানা না থাকলে, যুক্তরাজ্যে নিয়োজিত বাংলাদেশের হাই কমিশন মারফত একটা চিঠি তার কাছে পৌঁছে দেয়া কোন বিষয়ই না। তা নইলে তার স্থায়ী ঠিকানা বাংলাদেশে তার মায়ের বাসার ঠিকানায় পাঠাতে পারতেন। আর তথ্য প্রযুক্তির এই দিনে একটা ই-মেইল করতে সর্বোচ্চ দশ মিনিটের বেশী সময় লাগার কথা নয়। অথচ তার চাকরিচ্যুতির খবরটি ঢাকঢোল পিটিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে মন্ত্রী মহাশয় সংসদে উত্থাপন করেছেন এবং অন্য সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তা উপভোগ করেছেন। সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই সংসদ!

মরহুম রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা ডাঃ জোবায়দা রহমান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্রবধু। সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি আপন মহিমায় ভাস্বর। সব সময় নিজেকে রাজনীতির বাহিরে রেখে একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। সেবার ব্রত নিয়ে সরকারী দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অনেক সামাজিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত ছিলেন। নিজেকে সযতনে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। প্রচার বিমূখ জোবায়দা রহমান নিভৃতে নিরবে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন চিকিৎসা সেবায়। ক্যারিয়ারের কথা না ভেবে শুধুমাত্র মানব কল্যানের নেশায় ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ হেলথ ক্যাডারে যোগদান করেন তিনি। কোন ধরনের বাঁধা তার কর্মস্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আপন মহিমায় সমুজ্জল ডাঃ জোবায়দা রহমান কাজ করেছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। গ্রাম গঞ্জের মানুষকে দিয়েছেন চিকিৎসা সেবা।

ডাঃ জোবায়দা রহমানকে অন্যায় ভাবে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দেয়ায়, তিনি কতখানি ক্ষতিগ্রস্থ হলেন তা না বলতে পারলেও, বাংলাদেশের অগনিত হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী যে তার মতো একজন স্বনামধন্য কর্ডিওলজিস্টের উন্নত সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন তা র্নিদ্বিধায় বলতে পারি। এ যেন নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভংগ করার মতো ব্যাপার। যেখানে ডাঃ জোবায়দা রহমানের মেধা ,যোগ্যতা ও অর্জনকে কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রভুত উন্নতি সাধন করা সম্ভব ছিলো,সেখানে তাকে একেবারে স্থবির করে দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত বিনয়ী ও মিষ্টভাসী ডাঃ জোবায়দা রহমান অরাজনৈতিক ব্যক্তি হয়ে ও রাজনীতির রোষানল থেকে রেহাই পাননি।

গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন ভাবে রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে সেখানে শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী পরিবারের পূত্রবধু এবং তারেক রহমানের স্ত্রী হবার কারনে রাজনীতির হীন চক্রান্তের শিকার হয়ে যে নিগ্রহের শিকার হতে হলো তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্ক টিকা হয়ে থাকবে।

নিতান্তই ভদ্র মার্জিত ডাঃ জোবায়দা রহমান কখনো কোন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেননা। চিকিৎসা সেবাকেই মহান ব্রত হিসাবে নিয়ে সবসময় রাজনীতি থেকে ছিলেন অনেক অনেক দূরে। এতকিছুর পরেও তিনি রেহাই পাননি। তাকে অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে চাকুরীচ্যুত করা হলো। একজন অরাজনৈতিক মেধাবী ও সম্ভাবনাময়ী নারীকে শুধুমাত্র ভিন্ন মতাদর্শের কাউকে জীবনসঙ্গী করার অপরাধে যে অন্যায় করা হলো তার দায়ভার রাষ্ট্র কোন ভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেনা।

লেখক : সাংবাদিক

 

Comments

comments

     এ জাতীয় আরো খবর