রাজবাড়ী জেলার মধ্যে ব্যয় বহুল ১০১ মূর্তি বিশিষ্ট দূর্গা প্রতীমা নির্মাণ হচ্ছে বালিয়াকান্দির আলোকদিয়ায়

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ২:৩৩ পূর্বাহ্ণ ,১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ | আপডেট: ২:৩৩ পূর্বাহ্ণ ,১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
পিকচার

নিজস্ব প্র্রতিবেদক : রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১৩৮টি মন্ডপে সার্বজনীন শারদীয় দূর্গোৎসব অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি দ্রুত গতিতে চলছে।

প্রতীমা শিল্পীরা দেবী দূর্গা, স্বরসতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গনেশসহ নানা দেব-দেবীর প্রতীমার রূপকে ফুঁটিয়ে তুলছেন নিপুন হাতের ছোঁয়ায়। পূজা মন্ডপে আঁকা হচ্ছে রকমারি আল্পনা। সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বী সব মানুষের মনে খুঁশির আনন্দে দোল দিচ্ছে। মন্ডপে মন্ডপে মাটি আর খড়ে গন্ধ মিলেমিশে একাকার। কোথাও দেবীর হাতের আঙ্গুল বানানো হচ্ছে। কোথাও আবার পরম যত্নে শিল্পী তৈরী করছেন দেবীর মুখের ছাঁচ। নিরাভরণ দূর্গা প্রতিমা দিকে দৃষ্টি ফেললে শিল্পীর হাতের যাদুতে এখনই মনে হচ্ছে মহালয়ার আগেই প্রান পেয়েছে দেবী দূর্গা। পূজার কেনাকাটাও চলছে পুরোদমে। গ্রামে থেকে শুরু করে শহরের দোকান ও বিপণী বিতান গুলোতেও হিন্দু সম্প্রদায়ের নর-নারী ও শিশু কিশোরদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবারের পূজা উপলক্ষ্যে বেচাকেনা ভাল হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও খুশি। দূর্গাপূজা আগে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ঋতুতে হতো। ভারত ও বাংলাদেশে শরৎ ও বসন্ত- দুই ঋতুতে এই পূজা হতো। তবে বাংলা এবং আশপাশের অঞ্চল গুলোতে ধুমধামের সাথে শরৎ কালেই এই পূজা করা হয়। যে কারণে এই পূজার আর এক নাম শারদীয়া দুর্গোৎসব। এবার ভক্তের আকাঙ্খা পূর্ণ করতে মা দূর্গা আসবেন শরতে, তাই ঢাকের বাজনা, উলুধ্বনি ও আরতীতে মুখরিত হবে শহর, পাড়া মহল্লা ও গ্রাম। দর্শনার্থীদের আনন্দ ও নিরাপত্তা দিতে গ্রাম শহরের সড়কগুলোতে চলছে বিভিন্ন প্রস্তুতি যেমন-অলোক সজ্জা, তোরণ ও মন্ডপ আকর্ষণীয় করতে রঙ্গিন বাতি। পূজা মন্ডপের সামনে তৈরী করা হয়েছে দৃষ্টি নন্দন তোরণ।
এ বছর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের নলিয়া জামালপুর-আলোকদিয়া গ্রামে সার্বজনীন দূর্গা মন্দিরে। পুকুরের উপর রামায়নের কাহিনী অবলম্বনে ১০১টি বিভিন্ন দেব দেবীর মূতি উপস্থাপন করে সবচেয়ে ব্যয় বহুল জাকজমক পূজা উপহার দিতে চলছেন মন্দির কর্তৃপক্ষ।

এ মন্দিরে প্রতি বছরেই বাড়তি ভক্তের মনোরঞ্জনে ব্যতিক্রমধর্মী সাজ সজ্জায় বাড়তি আকর্ষণ থাকে। যা গোবিন্দ বিশ্বাসের নির্দেশনায় হয়ে থাকে। প্রতিমা শিল্পী ফরিদপুরের বিলাশ পাল জানালেন, গত ৩মাস পূর্ব থেকেই তিনি ঠাকুর গড়ার কাজ করে চলছেন। আমার সঙ্গে ১০জনসহ শিল্পী কাজ করে চলছেন। শতাধিক মূর্তির মধ্যে রাজা দশরথ, তার ৩রাণী, ৪পুত্র রাম, লক্ষণ, ভরত ও শত্রুঘœ, রাজা অসুস্থ, রাণী কৈকের বর, রামের বনবাস, সীতা হরণ, রাম রাবনের যুদ্ধ, শক্তির আরাধনা, সুপর্ণখার নাক কর্তন, রামের নির্দেশে হনুমানের সেতু-বন্ধন, রামের শক্তির আরাধনা, রামের শক্তি পুজা ইত্যাদি। বাল্মিকী মুনির রামায়নের কাহিনী অবলম্বনে এ সব দেব-দেবী মূতিগুলো সার্বজনীন দূর্গা মন্দির সংলগ্ন জলাশয়ে ৩শত ফুট দীর্ঘ প্লাট ফর্মে স্থান পাবে। এ প্লাটফর্ম থেকে প্রায় ৪০ ফুট উপরে পর্বত শৃঙ্গে থাকবেন মহাদেব। তিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ড। জলাশয়ের বিভিন্ন স্তারে জীব শিক্ষার প্রয়োজনীয় কথোপকথন ও নির্দেশনা। যা অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ তা দেখেই নিজে ও পরিবারের জ্ঞানচক্ষু খুলতে পারবে। যা বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ। জলাশয়ে থাকবে কুমির ও হাতির সুর থেকে বের হবে পানির ফোয়ারা। যা আলোক সজ্জায় ভক্তকে মুগ্ধ করবে। বাইরে থেকে জলাশয়ে নির্মিত মন্দিরটি দেখলে মনে হবে কোন সুরঙ্গ।

গৃহবধু পুষ্পরাণী বিশ্বাস জানান, প্রতিবছর আমরা এই দিনটির জন্য সবাই অপেক্ষা করে থাকি। আমাদের গ্রামের বধুদের পিতা বাড়ী যাওয়া তো দূরের কথা, বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ভক্তবৃন্দ ও স্বজনদের সেবা করতে করতে কিভাবে যে মা দূর্গা বিদায় নেন তা টের পাই না। তবে দূর্গা পুজার মূল কাহিনী জানতে চাইলে তিনি জানান, অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী যখন অতিষ্ট, দেবতারা যখন স্বর্গ থেকে বিতাড়িত, তখন অসহায় দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের স্মরণাপন্ন হন। ব্রক্ষ্মার অমরত্ব লাভ করে মহিষাসুর ঈশ্বরের মত একক ক্ষমতা লাভ করতে চেয়েছিল। তাই তাকে কোন পুরুষের পক্ষে ধ্বংস করা সম্ভব ছিল না। তাই মহিষাসুরকে বধ করতেই নারীরূপে দূর্গার আবির্ভাব হয়। ঐ ত্রিশক্তি সম্মিলিত তেজে নারী রূপে দেবী দূর্গা শক্তির উৎভব হয়। দেবী দূর্গা আবার একাকী নন। তিনি অন্যান্যদের নিয়ে যেমন ধন(লক্ষী), শিক্ষা(স্বরস্বতী),কার্তিক(যোদ্ধা), গনেশ(সিদ্ধিদাতা), সকলকে নিয়ে মহিষাসুর বধে ব্রতী হন। সে যাত্রায় অসুররা সমূলে ধ্বংস হয়।

গোবিন্দ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, পৃথিবীতে এখনো নানা অত্যাচার শোষন নিপিড়ন রয়েছে। যে কাজগুলো সে যুগে অসুররা করতো। তাই আজও অন্যায়র বিরুদ্ধে দেবী দূর্গার পুজা অর্থবহ। শরৎকালে অসুর বধে মা দূর্গা সেদিন যে ভূমিকা রেখেছিলেন, আজও তা অন্যায় বন্ধ করতে প্রয়োজন। এই শিক্ষাই দেবী দূর্গার পূজার শিক্ষা। ঐক্যবদ্ধ সম্মিলিত চেষ্টাই হচ্ছে এই পুজার অনন্য সারমর্ম। তাই এটি সার্বজনীন পুজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চন্ডিপাঠ করে এই পুজা বা আরাধনা করে থাকেন। ধর্মমতে এ সময় দেবদেবীরাও দূর্গাপুজার জন্য প্রস্তুত হন, তারাও মা দূর্গার আরাধনা করেন। এ সময় পৃথিবীর মানুষ নদীতীরে পূর্ব পুরুষদের জন্য শন্তি কামানা করে থাকে।

পুরোহিত কনক কুমার রায় জানান, শাস্ত্রীয় বিচারে দেবীর এবার মর্ত্যলোকে আগমন ঘটবে নৌকায় চেপে এবং ফিরবেন দোলায় করে কৈলাশ পর্বতে স্বামীগৃহে। নৌকায় আগমনের অর্থ হলো দেশে ফসল ভালো হবে ও জল বৃদ্ধি পাবে। আর দোলায় গমন মানে ঝড় বৃষ্টি বৃদ্ধি পাবে, মড়ক হবে বা লোকক্ষয় ঘটবে।

উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অবঃ অধ্যক্ষ বাবু বিনয় কুমার চক্রবর্তী জানান, ৩০ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠ পুজার মধ্য দিয়ে দেবীর বোধন হবে। ৪ অক্টোবর দেবী দূর্গা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে বিজয়া দশমী পালিত হবে। এ পূজা পালন আমাদের মধ্যে অসুরবৃত্তি দমন করতে ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে ভুমিকা রাখবে।

 

আপডেট : বৃহস্পতিবার সেপ্টেম্বর ১৮,২০১৪/ ০৮:৩২ এএম/ আশিক

 

 


এই নিউজটি 1862 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments