কয়েকটি ইউনিয়নে ভিজিএফ চালের স্লীপ বানিজ্য : সরকারী বরাদ্দের বেশীরভাগ হাতিয়ে নিচ্ছে নেতাকর্মীরা : প্রকৃত দুঃস্থরা বঞ্চিত!

|রাজবাড়ী নিউজ24

প্রকাশিত: ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ ,৩ অক্টোবর, ২০১৪ | আপডেট: ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ ,৩ অক্টোবর, ২০১৪
পিকচার

নিজস্ব প্রতিবেদক : পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে রাজবাড়ীতে বরাদ্দকৃত ভিজিএফ কর্মসূচীর চাল পাচ্ছে না প্রকৃত দুঃস্থরা। সরকারী বরাদ্দের বেশীরভাগ নেতাকর্মীরা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল  বৃহস্পতিবার দুপুরে গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়ন পরিষদে ঢুকতেই দেখা যায় চকচকে চেহারার এক যুবক এক বস্তা চাউল নিয়ে রিক্সায় করে চলে যাচ্ছে। কিছুটা এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের করুণায় পাওয়া স্লীপ হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন অসহায় নারী-পুরুষ।

তাদের অনেকেরই চাউলগুলো নেয়ার মতো বস্তা, ব্যাগ বা এ জাতীয় কিছু নেই। পরণের শাড়ী বা লুঙ্গিই তাদের একমাত্র ভরসা। কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই এক দালাল এসে জেঁকে ধরল, বলল স্লীপ বিক্রি করবেন কি না? ধকল সামলে বুঝতে পারার পর দেখা গেল তার হাতে একগাদা স্লীপ। নিজের নাম জামাল মন্ডল, বাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই উল্লেখ করে ‘৯ কেজি মালের প্রতিটি স্লীপ নগদ ২১০/২২০টাকা’ বলে অফার করল। সে আরো বলল, তারা ৫/৬জনে মিলে কয়েকশত স্লীপ কিনেছে। একত্রে বেশী করে নিলে খারাপ দেখা যায় বলে কয়েক মিনিট পরপর স্লীপগুলো ভাঙাচ্ছে।

কাদের কাছ থেকে স্লীপগুলো কিনেছে জানতে চাইলে জামাল দাবী করল, দুঃস্থরাই নগদ টাকার প্রয়োজনে স্লীপগুলো বিক্রি করছে আর তারা কিনে নিচ্ছে। কিন্তু সেখানে প্রায় দুই ঘন্টা অবস্থানকালে একজন দুঃস্থকেও স্লীপ বা চাউল বিক্রি করতে দেখা যায়নি।

জামালকে এড়িয়ে চাল বিতরণের কক্ষে(গ্রাম আদালত কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত) গিয়ে দেখা গেল ইউপি সচিব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা হোসনে আরার প্রতিনিধি হিসেবে তার অফিসের একজন কর্মচারী স্লীপগুলো বুঝে রেখে ৯ ও সাড়ে ৪ কেজি করে চাউল বিতরণ কার্যক্রম তদারকী করছেন। ২/৩জন দুঃস্থ চাল নেয়ার পরই ঢুকে পড়ছে একজন দালাল। ৫/৭টি করে নেয়ার পর আবার দু’একজন দুঃস্থ নিচ্ছে। এভাবে মাত্র আধ ঘন্টার ব্যবধানে দেখা গেল একেকজন দালাল অন্তত ২০/২৫টি করে স্লীপ ভাঙালো। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা বললেন চেয়ারম্যান আসেননি। মেম্বাররা কয়েকজন এলেও একজন বাদে সবাই চলে গেছেন। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় স্লীপ না পাওয়া প্রকৃত দুঃস্থদের বিলাপ করে বলতে শোনা গেল, হায়রে আল্লাহ্, কার হক কে খাচ্ছে! এমনকি একাধিক গ্রাম পুলিশ সদস্যকেও একই রকমের আক্ষেপ করতে শোনা গেল। এছাড়াও দালালদের যার যার অংশের চাল যার যার নির্দিষ্ট স্থানে স্তুপ করতে দেখা গেল।

সৌভাগ্যবান যে ২/৪জন জন ৯ কেজি, সাড়ে ৪ কেজি করে চাল নিয়ে বের হচ্ছিলেন তাদের কাছে জানতে চাইলাম ‘কেন অনেকে চাল না নিয়ে স্লীপ বিক্রি করছে’-জবাবে তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন চাল আবার কে বিক্রি করল! সেগুলোতে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আর দলের লোকজন বিক্রি করেছে। এখন ‘গরীবরা বিক্রি করছে বলে’ ধোঁয়া তুলে মিথ্যা বলে চালগুলো বের করে নেয়া হচ্ছে।

সেখান থেকে বের হয়ে আসার পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে গোয়ালন্দ জামতলা মোড়ে সাক্ষাত করে ‘ভিজিএফ চালের এ অবস্থার ব্যাপারে জানতে চাইলে’ ছোট ভাকলা ইউপির চেয়ারম্যান মোঃ আমজাদ হোসেন বললেন, তার ইউনিয়নের জন্য ৮.২ মেঃ টন (৮হাজার ২শত কেজি) চাল পাওয়া গিয়েছিল। যার মোট স্লীপের পরিমাণ ৮২০টি। সেই ৮২০টির মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান নিয়েছেন ১০শতাংশ এবং দলের লোকজনকে দিতে হয়েছে ২৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ৬৫ শতাংশের মধ্যকার ২০ শতাংশ তিনি এবং ৮০ শতাংশ সকল মেম্বার মিলে ভাগ করে নিয়েছিলেন। তার ভাগে যেটুকু পড়েছিল তা তিনি সুষ্ঠুভাবেই বন্টন করেছেন। স্লীপের চেয়ে লোক বেশী হওয়ায় অনেককে ৫ কেজি করে দেয়া হয়েছে। অন্যেরা কে কি করেছে তা তার জানা নেই। তবে অনেকে আছেন যারা চালগুলো তুলে আরো ভাল মানের চাল কিনে খাওয়ার কথা বলে আবার অনেকে জরুরী নগদ টাকার প্রয়োজনে স্লীপগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন।

ছোট ভাকলার পার্শ্ববর্তী দেবগ্রাম ইউপির চেয়ারম্যান আতর আলী সরদারের ভিজিএফ চাল বিতরণের চালচিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সর্বমোট ১০৬০টি স্লীপ(১০.৬টন) তিনি পেয়েছিলেন। উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের অংশ দেয়ার পর থাকা ৭শত স্লীপের মধ্যে শতকরা ২০ শতাংশ হিসেবে তিনি পান ১৪০টি স্লীপ, যেগুলো তিনি সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করেছেন। চাল বিতরণের সময় কয়েকজন অনুপস্থিত থাকায় রিলিফ বিতরণের রীতি অনুযায়ী তিনি উপস্থিত দুঃস্থদের মধ্যে অবশিষ্ট চালগুলো বন্টন করে দেন। স্লীপ পাওয়া ২/৪জন যারা যথাসময়ে চাল উত্তোলন করেনি, তাদেরকে তিনি স্লীপগুলো যত্ন করে রাখতে বলেছেন। সময়-সুযোগ মতো তাদেরকে অবশ্যই সেই স্লীপের চাল দেয়া হবে। বরাদ্দকৃত স্লীপের সিংহভাগই অন্যরা নিয়ে গেলেও বিতরণের তদারকীর দায়িত্ব তারই। নিয়ম অনুযায়ী কড়াকড়ি করতে গেলে ঝামেলা অনিবার্য হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অপরদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সদর উপজেলার মূলঘর ইউপির ভিজিএফের চালও বিতরণ করা হয়। মূলঘর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আঃ মান্নান মোল্লা জানান, বরাদ্দকৃত স্লীপের মধ্যে ৩২০টি আওয়ামীলীগকে এবং ১৪৪টি তার দলকে দেয়া হয়। তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন দু’দলের নেতাকর্মীরা মিলেমিশে চালগুলো বিতরণ করার কিন্তু ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি মোঃ ওহিদুজ্জামান তার প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে তাদের ভাগের স্লীপগুলো নিয়ে নেন। নিজেদের ১৪৪টি সুষ্ঠুভাবে বিতরণের দাবী করলেও তিনি অন্য স্লীপগুলো বিতরণের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

 

আপডেট : শুক্রবার অক্টোবর ০৩,২০১৪/ ‌১১:৫৫ এএম/ আশিক

 


এই নিউজটি 1223 বার পড়া হয়েছে

Comments

comments